আল্লাহ নিরাকার নন, এর মানে কি আল্লাহর আকার আছে?

যারা আমাকে বিভিন্ন থটফুল লেখার লিংক পাঠিয়ে আপডেট রাখেন তাদের একজন কিছু দিন আগে মুনিম সিদ্দিকী নামের একজন শক্তিশালী লেখকের একটা লেখার লিংক পাঠালেন। পড়ে চমৎকৃত হলাম। এরপর হতে উনাকে নিয়মিত ফলো করি। আল্লাহ সাকার নন, নিরাকার– এটা নিয়ে তিনি আজ দুপুরে একটা স্ট্যাটাস দেন। তাতে আমি যে মন্তব্য করেছি তা নিয়ে এই পোস্ট।

কিছু লোক অহেতুক তর্ক করে। তাই আমি পারতপক্ষে কাউকে ট্যাগ করি না। ট্যাগ না করার সুবিধা হলো এক পর্যায়ে যদি কাউকে জোর করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ‘জেহাদে’ রত দেখা যায় তখন তাকে বলা যায়, আমি তো আপনাকে ডেকে আনি নাই, এটি আমার ওয়াল…। তাই জনাব মুনিম সিদ্দিকীর পোস্ট হতে যার মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিচ্ছি তার নাম না ধরে হুবহু বক্তব্যটা তুলে ধরছি।

আল্লাহর অবশ্যই আকার আছে।

কিন্তু  তার আকার কেমন তা আমরা জানিনা। তিনিই ভাল জানেন। এবং কুরআনে আল্লাহ নিজের  দুই হাতের কথাও উল্লেখ করেছেন কিন্তু সেই দুই হাতের আকার কেমন তা আমাদের  কল্পনার বাইরে।

তবে মনে মনে বা প্রকাশ্য আল্লাহর কোন আকার কল্পনা করা স্পষ্ট পথভ্রষ্টতা কারন যে সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান নেই তা আমরা ধারণা করতে পারিনা

আল্লাহর আকার আছে– এমন অদ্ভুত দাবি করতে হলে হয়তো (১) আল্লাহ সাকার অথবা নিরাকার– এই বাইনারিকে অস্বীকার করতে হবে, অথবা (২) আল্লাহর অকল্পনীয় এক আকার আছে তা ভাবতে হবে। দেখুন, আমি এক্ষেত্রে অনির্ব্চনীয় কথাটা ব্যবহার করি নাই। কারণ, উপরের মন্তব্যেই দেখতে পাচ্ছেন কুরআনের বরাতে আল্লাহর বচনীয় অর্থাৎ বর্ণনাযোগ্য অংগ-প্রত্যংগ থাকার ওপর বিশ্বাস করতে বলা হয়েছে।

আচ্ছা, অকল্পনীয় সত্তা হতে পারে, অস্তিত্ব হতে পারে, আকার তো হতে পারে না। আকার ও অস্তিত্ব যে কোনো সৃষ্ট কিছুর জন্য প্রযোজ্য। আল্লাহর জন্য এটি প্রযোজ্য নয়। হতে পারে না।

যারা উপর্যুক্ত মন্তব্যকারীর উদ্ধৃতিকে এরপরও সঠিক মনে করেন, তাদেরকে শেষ পর্যন্ত  বলতে হবে, আল্লাহর (অকল্পনীয়) আকার আছে, যা সাকার ঈশ্বর ধারণার একটা বিশেষ ব্যতিক্রমী রূপ। জানি না, অতি আন্তরিক বুজুর্গরা ‘আল্লাহর আকার আছে’ এমন counter-intuitive কথা কীভাবে বলেন! হতে পারে, উনারা সত্তা ও আকারের সম্পর্ককে সর্বাবস্থাতেই অনিবার্য মনে করেন।

যদি এমন হয় যে, কোরআনে বলা হয়েছে, তাই তারা এমন অদ্ভুত দাবি করেন, যেহেতু কোরআনকে হুবহু মানতে হবে তাই, তাহলে দোস্ত-বুজুর্গ এসব অতি শুদ্ধতাবাদীদের (puritanic) সম্পর্কে হতাশই হতে হয়। কোরআনের পাঠক মাত্রই জানেন, কোরআনে দুই ধরনের আয়াত আছে। যা কোরআন নিজেই ক্লিয়ারলি বলে, আয়াতে মুহকাম বা দ্ব্যর্থহীন আয়াত এবং আয়াতে মুতাশাবিহ বা অনির্দিষ্ট অর্থ সম্পন্ন আয়াত। এর অতিরিক্ত হিসাবে মুহকাম ও মুতাশাবিহ আয়াতের কোনো তালিকা দেয়া হয় নাই। বৈশিষ্ট্য তথা অর্থ নিরূপণের ধরন নির্ণয়ের মাধ্যমে আমরা ঠিক করি, কোনটা মুহকাম আয়াত, কোনটা আয়াতে মুতাশাবিহ। হতে পারে এসব অর্গানিক বর্ণনা আয়াতে মুতাশাবিহ’র অন্তর্গত, যা হতে শুধুমাত্র শিক্ষা গ্রহণ করা যাবে। সেগুলোর বিস্তারিত খুঁটিনাটি নিয়ে এনগেজ হওয়া যাবে না।

যদি বলা হয় যে, এই আয়াতগুলো মুহকাম। অতএব এগুলোকে প্রত্যক্ষভাবে তথা লিটারেল সেন্সেই মানতে হবে। তাহলে, বর্ণনাগুলোর ফেইসভেলু অনুসরণ করে সরাসরি (মূর্তিপূজকদের মতো) খোদার মুখ-হাত-পা থাকার অর্থ গ্রহণ করা হবে না কেন? যদি সুরা ইখলাসের ‘কুফুয়ান আহাদ’ তথা কোন কিছুর মতো নহে – এই জাতীয় তাওহীদি আয়াতসমূহের সাথে সমন্বয়ের ব্যাপার থাকে, তাহলে, পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বারে বারে যে চিন্তা-ভাব্না-ফিকির করা তথা বিবেক-বুদ্ধিকে কাজে লাগানোর কথা অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেছেন সেই আয়াতগুলোকেও তো সমমর্যাদায় প্রত্যক্ষ বিবেচনায় রাখতে হবে। কিছু বাদ দিবেন, কিছু সমন্বয় করবেন এবং কিছু কিছুকে সমন্বয়ের কথা বলে কার্যত বাদ দিবেন, তাতো হয় না।

কোরআনের যে ইজায বা অলৌকিকত্বের কথা কোরআনেই বারম্বার দাবি করা হয়েছে, ইজাযুল কোরআন সম্পর্কিত কিতাবাদিতে দেখা যায়, কোরআনের অনন্য সাহিত্য গুণ এই অলৌককত্বের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য বা প্রমাণ। ভাষা যাই হোক না কেন, উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও রূপক ছাড়া সাহিত্য হয় না। যদি এটি মানেন, তাহলে বলুন, লিস্টি করুন, কোরআনে বর্ণিত উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও রূপকমূলক আয়াত কোনগুলো। দেখবেন আল্লাহর মুখ, হাত, পা সব এতে একোমোডেইট হয়ে যাচ্ছে। এখন ভাষায় ব্যবহৃত উপমামূলক বর্ণনাকে কেউ যদি আক্ষরিকভাবে নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে শোভন কথা কী হতে পারে, তা আমার জানা নাই।

উপরে উল্লেখিত উদ্ধৃতির একটা অংশ হচ্ছে “হাদিসে এসেছে জান্নাতে মুমিনরা আল্লাহকে দেখবে। আর যার আকার নেই তা  দেখতে পাওয়া যায়না। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন জান্নাতে জান্নাতবাসীরা  আল্লাহকে স্পষ্ট দেখতে পাবে। “

মুসলিম দর্শনে এ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক আছে। এটিকে ‘দিব্য দর্শন’ বা beatific vision সম্পর্কিত সমস্যা বলা হয়। মুসলিম ফিলোসফিতে এই নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কী কথাবার্তা, যুক্তি-পাল্টা যুক্তি আছে তা আলোচনার পরিসর এটি নয়। এ ব্যাপারে আমি শুধু স্ট্যান্ডার্ড আশারিয়া কনসেপ্টটাই তুলে ধরবো। আশারিদের মতে, আল্লাহর কোনো আকার নাই যে তা দেখা যাবে। তৎসত্বেও কোনো কিছু সাকারে সাক্ষাত দেখার যে প্রবল প্রত্যক্ষণ-অনুভূতি, তা মুমিন বান্দাহদের মধ্যে সৃষ্টি করার ক্ষমতা আল্লাহ রাখেন।

আমার মতে, বেহেস্তে প্রতি শুক্রবার আল্লাহকে দেখতে পাওয়ার বর্ণনার মানে হলো সেই সময়ে মানুষ আল্লাহর এমন দয়া, প্রেম, ভালবাসা লাভ করবেন, তাঁর এমন মহিমা প্রত্যক্ষ করবেন, যা ইতোপূর্বে তারা পান নাই, অনুভব করেন নাই। এভাবে অনন্ত কাল ধরে তারা মহান প্রভুর সান্নিধ্য লাভ করলেও শেষ পর্যন্তও তা দুনিয়ার জীবনে ঈমান আনার সময়কার অপ্রতুলতার মতো অপ্রতুলই থেকে যাবে।

পরম সত্তার সাথে ব্যক্তি সত্তার সম্পর্ককে ওয়াহদাতুশ শুহুদ তথা সত্ত্বার (অতি) নৈকট্য অর্থেই বুঝতে হবে। আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা মানে তার দয়া ও ভালবাসা লাভ করা। আল্লাহ সম্বন্ধে অধিকতর জ্ঞান লাভ করা। যা স্বত:ই অপূর্ণ। এ  এমন এক পথ যা সঠিক কিন্তু অন্তহীন। প্রতিটা মনযিলকেই অজ্ঞ পথিক মঞ্জিল ভেবে তৃপ্ত হবে। কিন্তু সহসাই তার ভুল ভাংগবে। অত:পর সে এগোবে। এবং এগোতেই থাকবে। আবাদান আবাদা, খা-লিদীনা ফিইহ ….

ফেসবুকে প্রথম প্রকাশিত

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক।