সংশয়বাদী BIV যুক্তি, মানবীয় চিন্তার ঐশ্বরিকতা ও সত্য জ্ঞান লাভের উপায়

BIV মানে Brain-in-Vitamin। অর্থাৎ আমাদের ব্রেইন শরীর থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি, সাধারণ মানুষের ভাষায় যাকে আমরা নানা রকমের ভিটামিন বলতে পারি, লাভ করে। এ ছাড়া আরও একটা কিছু আমাদের শরীর থেকে মস্তিষ্কে যায়। তা হলো নানা রকমের অবিরাম অভিজ্ঞতার উদ্দীপনা বা ইন্দ্রিয় তথ্য প্রবাহ।

আমরা কল্পনা করতে পারি, কোনো ব্রেইনকে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। সেটিকে একজেক্টলি এমন নিউট্রিশানের মধ্যে রাখা হয়েছে যা সেটির সজীব থাকার জন্য জরুরী। পরিমাণ মতো প্রয়োজনীয় ‘ভিটামিন’ তথা পুষ্টি সেটি যথাযথভাবে লাভ করছে। একইসাথে উক্ত মস্তিষ্কের স্নায়ুরজ্জুগুলো একটা কম্পিউটারের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। আমাদের বডি হতে যেসব ইন্দ্রিয়জ তথ্য ব্রেইনে পৌঁছে, এ ক্ষেত্রে উক্ত কানেকেটেড পিসি হতে হুবহু সেই ধরনের স্নায়ুতথ্য পরিকল্পনা মোতাবেক সরবরাহ করা হচ্ছে।

তাহলে এনভেইটেড উক্ত ব্রেইনে যদি খাওয়ার অনুভূতি সাপ্লাই করা হয় তাহলে শরীরবিহীন উক্ত ব্যক্তি খাচ্ছে মনে করবে। যদি চলার অনুভূতি উক্ত সংযুক্ত কম্পিউটারের সিপিইউ হতে সাপ্লাই করা হয় তাহলে ভিটামিনের জারের মধ্যে আবদ্ধ অথচ জীবন্ত উক্ত ‘মস্তিষ্ক-ব্যক্তি’ চলাফেরা করছে বলে মনে করবে। এভাবে ভবিষ্যতের উন্নততর বিজ্ঞানের পক্ষে যখন মানুষের সকল কার্যক্রমের নিখুঁত সিমিউলেশন করা সম্ভব হবে, তখন কেউ প্রকৃত অভিজ্ঞতা লাভ না করেও কোনোকিছুর ‘প্রকৃত স্বাদ’ লাভ করতে পারবে।

ব্যাপারটা স্বেচ্ছায়ও হতে পারে। আবার অনিচ্ছায় বা অজ্ঞাতেও হতে পারে। আমরা যদি থ্রি-ডি সিনেমা দেখি, তখন মনে হয়, আমরা যেন ঘটনারই অংশ। একেবারে জীবন্ত মনে হয়। স্বেচ্ছাকৃত বি-আই-ভি সিচুয়েশন যেন নাইন ডাইমেনশনাল কোনো সিনেমা। এ ধরনের অকল্পনীয় উন্নততর পরিস্থিতিতে প্রকৃত ঘটনা, শুটিং আর সিনেমা দেখার মধ্যকার প্রচলিত পার্থক্য থাকে না।

অনিচ্ছাকৃত বা অজ্ঞাতসারে এনভেইটেড হওয়ার একটা তুল্য ঘটনা হচ্ছে স্বপ্ন। আমরা যখন স্বপ্ন দেখি, তখন সকল ‘প্রমাণ’ সহকারেই আমরা সেটিকে সত্যিকারের মনে করি। স্বপ্ন যে স্বপ্নমাত্র, ‘বাস্তব’ নয়, তা আমরা জেগে উঠার আগে বুঝতে পারি না।

যদি আমরা কখনোই জেগে না উঠতাম? এমন যদি হয়, আমরা যাকে জাগরণ বলছি তাও এক পর্যায়ের স্বপ্নমাত্র? বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নির্ভর সিনেমা INCEPTION-এ স্বপ্নের ভিতরে স্বপ্ন, এভাবে প্রায় ১০ স্তরে স্বপ্নের কাহিনী আছে। যেটাকে সত্যিকারের বাস্তবতা মনে করছি, গেরান্টি কী যে, এটিও আদতে ততটা বাস্তব নয়?

প্লাটো তার জ্ঞানতত্ত্বে বলেছেন, সত্যিকারের জ্ঞান হলো অবস্তুগত বিশুদ্ধ ধারণা। ধারণার জগতই প্রকৃত জগত। আমাদের দেখা-জানা বস্তুজগত হলো ওয়ার্লড অব আইডিয়াজের প্রতিফলন (ফেনোমেনন) মাত্র। বিষয়টা বুঝানোর জন্য তিনি একটা গল্প বলেছেন। কিছু মানুষকে একটা পাথুরে গুহার দেয়ালের দিকে বেঁধে রাখা হয়েছে। তারা কেউ কাউকে সরাসরি দেখে নাই। কোনো মানুষকেও তারা দেখে নাই। তবে কিছু মানুষ গুহার মুখ পেরিয়ে সকালে কাজে যায়। আবার বিকেলে ফিরে আসে। আজীবন গুহায় উল্টামুখ করে বেঁধে রাখা মানুষগুলো গুহার বাহিরে হেটে যাওয়া মানুষদের পারষ্পরিক কথাবার্তা নিয়মিত শুনে। গুহার দেয়ালে ওইসব মানুষদের যেসব ছায়া পড়ে সেগুলোও তারা দেখে। এ থেকে তারা ‘যথার্থই’ ভেবে নিয়েছে, ওই চলমান ছায়গুলোই আসল মানুষ। ছায়াগুলোই কথা বলে। একদিন তারা গুহা হতে মুক্ত হয়ে বাহিরে এসে দেখলো, এতদিন তারা যা ‘জেনে’ এসেছে, তা ভুল।

কোনো এক অপদেবতা কি আমাদেরকে এভাবে ‘প্রকৃত’ সত্য হতে বঞ্চিত করে এক ধরনের ‘প্রতিফলিত সত্য’কে সত্য মনে করার জন্য বাধ্য করছে? এই প্রশ্নের উত্তরে যদি ‘না’ বলেন, তাহলে আপনার এই রহস্যময় আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি কী?

জ্ঞানের যাচাইকরণ তত্ত্বের অন্যতম evidentialism অনুসারে এনভেইটেড পারসন, ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখা ব্যক্তি যার ঘুম এখনো ভাংগেনি কিংবা গুহার রূপকে বর্ণিত উল্টামুখ বন্দীদের মতো, প্রকতপক্ষে অসত্য এমন ‘জ্ঞান’কে পর্যাপ্ত এভিডেন্স থাকার কারণে সত্য জ্ঞান হিসাবে গ্রহণ করার জন্য আমরা একান্তই যুক্তিসংগত (justified)। তাই না?

জ্ঞানের যাচাইকরণের বিকল্প তত্ত্ব হলো reliabilism। অর্থাৎ, আপনি রিলায়েবল কোনো সোর্স হতে যদি কিছু পান তাহলে তাকে আপনি সত্য জ্ঞান হিসাবে গ্রহণ করতে পারবেন। সে জন্য আপনি জাস্টিফায়েড। ভালো কথা। সমস্যা হলো, ইনিশিয়াল যে জ্ঞানকে আপনি ফর গ্রান্টেড সত্য ও সঠিক ধরে নিচ্ছেন, রিলায়েবল বলছেন, যার ভিত্তিতে সবকিছুকে যাচাই করছেন, তার ই বা ভিত্তি কিংবা প্রমাণ কী?

যে ব্যঙ কূয়ার মধ্যে থেকে কূয়াকেই সাগর মনে করছে সেটি তার ‘দোষ’ নয়। বড় জোর সীমাবদ্ধতা বলতে পারেন। তো, যাকে আপনি-আমি সাগর বলছি, আমাদের অবস্থাও যে কূয়ার ব্যঙের মতো ‘অকপট ভুল’ নয়, তার ই বা নিশ্চয়তা কী?

ব্যাপারটা খণ্ডিত দৃষ্টিভংগী বনাম সামগ্রিক দৃষ্টিভংগী চিহ্নিত করার ব্যাপার। যাকে আমরা সামগ্রিক বলছি, তদোপেক্ষা বৃহত কিছুর প্রেক্ষাপটে সেটি খণ্ডিতই বটে। শুধুমাত্র ঈশ্বরের পক্ষেই অখণ্ড সামগ্রিক দৃষ্টিভংগীকে ধারণ করা সম্ভব। ঈশ্বর প্রকল্পকে (God hypothesis) আপনি প্রকল্প-প্রস্তাবনার অধিক, সত্য সত্যই সত্যিকারের মনে করবেন কিনা, সেটি আপনার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ব্যাপার।

এক ধরনের ঐশ্বরিক অবস্থান ছাড়া কোনোকিছুকে সামগ্রিকভাবে দেখা ও মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। মানবীয় সব মূল্যায়নই খণ্ডিত ও প্রেক্ষিতনির্ভর হতে বাধ্য। যেহেতু আমাদের অস্তিত্ব নানাভাবে সীমায়িত তাই আমাদের পক্ষে অখণ্ড তথা সত্যিকারের ‘বাস্তব জ্ঞান’ অর্জন করা সম্ভব হওয়ার কথা না। হতে পারে আমরা envated, অথচ ভাবছি, আমরা স্বাধীন। তাহলে উপায়?

আমরা যদি দুনিয়ার বাদবাকী সব বস্তুর মতো এক ধরনের উন্নততর বস্তুমাত্র, তাহলে আমরা ‘তাহলে উপায়’ – এই প্রশ্ন করছি কেন? কোনো পদার্থ, উদ্ভিদ বা জীব কি নিজের টিকে থাকার বাইরে জগতের ‘আসল সত্যকে’ জানতে চায়? নিজের বেঁচে থাকার অতিরিক্ত কোনোকিছু নিয়ে ভাবিত না হওয়াই তো সারভাইবাল ইনস্টিঙ্কট বা বিবর্তন সূত্রের দাবী।

মন আছে কি? আসল সত্য কী? জগতের উৎপত্তি ও পরিণতি কী? এসব বড় বড় মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে, যতটুকু জানা যায়, কেবলমাত্র মানুষেরাই ভাবিত হয়, আলোড়িত হয়, বিতর্কে লিপ্ত হয়। এমনকি নিজের মত জোর করে চাপিয়ে দিতে উদ্যত হয়। হওয়াটাই স্বাভাবিক। পরমত সহিষনুতার কথা বলে আমরা বাধ্য হয়ে কিছু চেপে যাই বটে। আদর্শবোধ মাত্রই আগ্রাসী হতে বাধ্য।

হওয়াটাই স্বাভাবিক? কিন্তু, কেন?

কারণ, মানুষের মধ্যে খাওয়া-পরার বাইরেও জগত ও জীবন সম্পর্কে মৌলিক ভাবনা-চিন্তা করার এক ধরনের ‘ঐশ্বরিক ক্ষমতা’ আছে। ঈশ্বরকে মানুন বা না মানুন, মানুষের চিন্তাগত এই ঐশ্বরিক ক্ষমতাকে আপনি বা কেউই অস্বীকার করতে পারে না।

বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ ব্যক্তির কাছে সংশ্লিষ্ট বৃত্তটাই বিরাটতম একমাত্র জগত। কূয়ার ব্যঙের মতো সে কখনোই বুঝতে পারবে না, এটি ছোট্ট একটা বৃত্তমাত্র। অবশ্য, যদি তার এমন অশরীরি তথা চিন্তাগত ক্ষমতা থাকে যাতে করে শারীরিকভাবে বৃত্তাবদ্ধ হলেও সে মানসিক বা জ্ঞানগতভাবে বৃহত্তর দৃষ্টিভংগী হতে (from a birds eye point of view) সব কিছুকে দেখতে পায়, তাহলে তার পক্ষে আসলেই বলা সম্ভব, কোনটি আসল আসল, আর কোনটি নকল।

মানুষ তার অসাধরণ চিন্তন ক্ষমতা দিয়ে জগতকে অতিক্রম করে যেতে পারে। নিজেই নিজেকে জ্ঞান ও যাচাইকরণের বিষয়বস্ত (object of knowledge) বানিয়ে আত্মজ্ঞান অর্জন করতে পারে। এ হলো মানুষের আত্মিক ক্ষমতা। এই অদ্ভূত ‘আত্মা সত্তার’ উৎস হিসাবে আপনি কোনো বস্তুকে (যেমন, মস্তিষ্ক) দায়ী করেন বা না করেন, তাতে কিছু আসে যায় না।

একজন পাঁড় নাস্তিককেও স্বীকার করতে হবে, মানব মস্তিষ্ক এমন এক বস্তু যা অত্যন্ত উন্নতমানে চিন্তা করে। যাকে আমরা বুদ্ধি বলি। মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণী আছে কিনা, তা মানুষ জানার চেষ্টা করছে। এই বুদ্ধির রহস্য কী? বিবর্তনবাদ এই বুদ্ধির ডেভেলপমেন্ট প্রসেসকে আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করছে। এর উৎস ও বিশেষ উন্নয়ন গতিধারা বিবর্তনবাদের অগম্য।

এখানে এসেই সব নাস্তিকতা ধ্বসে পড়ে। কারণ, শুরুতেই আমরা ধরে নিয়েছি, বস্তু আর চিন্তন দু’টো আলাদা জিনিস। চিন্তনটা বস্তু থেকে আসে, নাকি অবস্তু কিছু থেকে আসে, তা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা। এখন যদি চিন্তনকে বস্তুর একটা বৈশিষ্ট্য বলা হয়, তাহলে বলতে হবে, বস্তু-চিন্তন আর চিন্তন-বস্তু একই জিনিস। যদি তা বলা হয় তাহলে সেটি red herring fallacy’র উদ্ভব ঘটায়। যেন, চলমান গোলপোস্টের মাঠে ফুটবল খেলা। বিতর্কের শুরুতে যাকে সব পক্ষ অকাট্য হিসাবে মেনে নিবেন, তর্কে জেতার জন্য কোনো পক্ষ এ ধরনের কোনো বেসিক প্রপজিশনকে অস্বীকার বা গুলিয়ে ফেলতে পারেন না। হ্যাঁ, তিনি বিতর্কটা হতে বেরিয়ে যেতে পারেন।

ডেকার্ট এ প্রসংগেই দেহ-মন সংক্রান্ত তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াবাদে বলতে চেয়েছেন। তার মতে, বস্তু আর চিন্তন অবিচ্ছেদ্য, কিন্তু স্বতন্ত্র সত্তা। বস্তু আর চিন্তনের মধ্যে সম্পর্ক অপরিহার্য (necessary), একাত্মতা (identical) নয়।

পরবর্তী আলোচনার বিষয় হতে পারে, সম্পর্কের প্রাসঙ্গিকতা (occasional or contingent), অপরিহার্যতা (necessity) ও একাত্মতার (identity) মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়। কিংবা দেহ-মন সম্পর্কিত ‘কড়া নাড়ার যুক্তি’ (the argument of door-knocking) নিয়েও আলোচনা হতে পারে। চবিতে যারা আমার সাথে মনোদর্শনের কোর্স করেছেন তারা আমার এই অভিনব যুক্তির সাথে পরিচিত।

সংশয়বাদী BIV যুক্তি, মানবীয় চিন্তার ঐশ্বরিকতা ও সত্য জ্ঞান লাভের উপায়” শিরোনামের পোস্টটিতে ৪টি মন্তব্য

  1. আসসালামুআলাইকুম স্যার, ধন্যবাদ জানাচ্ছি সাড়া দেয়ায়!
    অতএব…..আপনি বলতে চাচ্ছেন ’ভাব’ ঠিক থাকলে ভাষা গৌণ/..? অথচ আপনার ভাষার ব্যবহার এবং আমার ভাষার উপর ব্যবহারিক জ্ঞান দিয়েই আমি আপনার ভাবকে ভাবছি তাহলে যারা ভাষা ব্যবহারে অদক্ষ(যেমন আমি) তারা কি করে বুঝবে যে আমি আপনার ভাবকে সঠিকভাবে বুঝেছি কিনা এবং নিজের ভাবকে অপরের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারছি কিনা যেমনটি আপনি পারেন! জানিনা কি বললাম ! এই অধমকে যদি একটু জ্ঞান দিতেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

* চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক। আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।