উচ্চশিক্ষা পদ্ধতির গলদ কোথায়?

ক’দিন আগে ভাইবা বোর্ডে এক স্টুডেন্ট কথায় কথায় কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, “স্যার, ফিলোসফি ভালো লাগে। পড়াশোনাও করি। কিন্তু পরীক্ষা দিতে ভালো লাগে না।” মজার ব্যাপার হলো, পরীক্ষাভীতিতে আক্রান্ত অই স্টুডেন্ট অই ইয়ারের ভাইবাতে সবচেয়ে ভালো করেছে। ওদের পরবর্তী ইয়ারের লিখিত পরীক্ষার একটা কক্ষে পরিদর্শনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আজকে দেখলাম, অই স্টুডেন্টও পরীক্ষা দিচ্ছে। বুঝলাম, এই পেপারে সে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা দিতে এসেছে।

ক্লাস পারফরমেন্সের ভিত্তিতে যাদেরকে আমি ভালো স্টুডেন্ট হিসাবে বিবেচনা করি তাদের অধিকাংশেরই রেজাল্ট ততটা ভালো না। গ্রেড পয়েন্ট ৪-এর মধ্যে তারা ৩-এর কাছাকাছি। প্রতি ইয়ারেই তাদের দু’একটা সাপ্লি থাকে। এর জন্য তারা যতটুকু দায়ী তারচেয়ে বহুগুণ বেশি দায়ী হলো মান্ধাতার আমালের বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতি।

কোর্সের ৬০% নম্বর প্রেজেন্টেশান, এসাইনমেন্ট, সেমিনার, কুইজ ও উপস্থিতির হারের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করে বড়জোর অবশিষ্ট ৪০% নম্বর লিখিত পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ হতে পারে। তাতে করে যারা লেখায় ততটা চালু না, অথচ বুঝতে পারে ও বলতে পারে ভালো, তারা উপযুক্ততা অনুসারে গড়পরতায় এসে ন্যায্য ফলাফল লাভ করার সুযোগ পাবে।

অতি অবশ্যই দ্বৈত পরীক্ষক পদ্ধতি বাদ দিতে হবে। যিনি পড়াবেন, কারিকুলাম অনুসারে তিনিই সিলেবাস ও লেসন প্ল্যান তৈরী করবেন। সব নম্বরও তিনি পারফরমেন্সের ভিত্তিতে স্বীয় বিবেচনায় দিবেন। প্রয়োজনে স্টুডেন্ট যাতে ফলাফল চ্যালেঞ্জ করতে পারে, সেই সুযোগও থাকতে হবে। যারা অসাধু তারা যে কোনো পদ্ধতিতেই দুর্নীতি করার ফাঁক-ফোকর বের করতে পারবে। বিভাগে কোর্স সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়ে কেউ কাউকে ভিকটিমাইজ করার বাংগালী-প্রবণতাকে কিছুটা ঠেকানো সম্ভব।

আমি অবাক হয়ে যাই, দুনিয়ার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব অচল গুরুবাদী ও ছাত্র-নিগ্রহমূলক নিয়মকানুন চলে না, এখানকার সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেসব অপনিয়ম দিব্যি চলছে…! দুনিয়ার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এক একটা ক্লাসে কমে এক‌’শ হতে সর্বোচ্চ তিন’শ পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীকে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি করা হয় না। আমাদের শিক্ষার পদ্ধতিতেই আছে মানসম্পন্ন শিক্ষা লাভ না করার ‘নিশ্চয়তা’। ব্যাঙের ছাতার মতো মূলত রাজনৈতিক কারণে গজিয়ে উঠা এইসব সরকারী ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন এক একটা অদক্ষ জনশক্তি ও বেকার তৈরীর কারখানা…।

উচ্চশিক্ষা নয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাই সবার অধিকার। উচ্চশিক্ষা সমাজ ও রাষ্ট্রের চাহিদা, অবকাঠামোগত উপযোগিতা ও যোগ্যতার বিষয়। নিছক অধিকারের বিষয় নয়।

‘I am GPA 5’ টাইপের অযোগ্য স্টুডেন্টদের গণহারে পাশের বস্তা ধরিয়ে দেয়ার পাগলামিতে কোনো কোনো সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ও নেমে পড়েছে দেখছি। জিপিএ চারের মধ্যে ফিলোসফির মতো সাবজেক্টে তাদের স্টুডেন্টরা অনায়াসে ৩.৭/৩.৮/৩.৯ পাচ্ছে, একটাও ইংরেজী টেক্সট বই না পড়ে। চাকুরীর বাজারে স্টুডেন্টদের লাইন করে দেয়ার জন্য নাকি এমন করছেন তারা, ব্যক্তিগত আলাপে জেনেছি।

কী সাংঘাতিক কথা…! শহর এলাকার বাসগুলোর চাপাচাপির মতো এ যেন এক ধরনের জেদাজেদির ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে…! ক্লাস নেন বা না নেন, মাসের শেষে বেতন গোনা আর নিজেকে হরহামেশা বঞ্চিত-বঞ্চিত জিগির তোলা সুবিধাবাদী শিক্ষকরাই দেশের উচ্চশিক্ষার এই ভয়াবহ পতনের জন্য দায়ী। কথায় বলে, মাছের পঁচন মাথা থেকে…

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Mo Min: ভালো এনালাইসিস করেছেন স্যার। তাছাড়া কোর্স সিস্টেমের ও উন্নতকরণ দরকার। ওপেন ক্রেডিট সিস্টেমের বিকল্প দেখছি না। কোর্সে বৈচিত্র্য থাকা দরকার, যাতে ভবিষ্যত প্লান অনুযায়ী স্টুডেন্টরা তাদের পছন্দসই কোর্স বাছাই করতে পারে।

Farjana Fatema: এই ইংলিশ ভার্সনে এক্সাম দেয়ার পক্ষে আমি একমত। ভার্সিটি লেভেলে এসেও যদি বাংলা নিয়ে পরে থাকি! দেখা যাচ্ছে এমন অনেকগুলো ওয়ার্ড আছে যেগুলো অনেক টিচার ইংলিশে বললে আমরা হা করে তাকিয়ে থাকি! উনি যদি ওই ওয়ার্ডটা বাংলাতে বলেন তাহলে আমরা বুঝতে পারি… কিন্তু আগে থেকে যদি ইংলিশে পড়াতেন, তাহলে ওয়ার্ডগুলো জানতাম আমরা…L

Gazi Tarek Hosen: “কোর্সের ৬০% নম্বর প্রেজেন্টেশান, এসাইনমেন্ট, সেমিনার, কুইজ ও উপস্থিতির হারের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করে বড়জোর অবশিষ্ট ৪০% নম্বর লিখিত পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ হতে পারে। তাতে করে যারা লেখায় ততটা চালু না, অথচ বুঝতে পারে ও বলতে পারে ভালো, তারা উপযুক্ততা অনুসারে গড়পরতায় এসে ন্যায্য ফলাফল লাভ করার সুযোগ পাবে।”

স্যার, এই সিস্টেমটার সব সময় আমায় ভাবায়। আমার মনে হয়ে আসছিল যে অন্তত একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পদ্ধতি এমন ধরনের কিছু একটা হওয়া দরকার, ৪ ঘণ্টা সিস্টেম বাদ দিয়ে। আর ৮-১০এক্সট্রা পেপারের নেওয়াটাকে অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী ভাল ফলাফলের হাতিয়ার মনে করে।

কিন্তু আমার মত,যারা মূল পেপার বা এর থেকে ২/১ এক্সট্রা পেপার এর বেশি নেই না বা নিতে পারি না তাদের ফলাফলটা ওই রকম হয়। যদিও আপনার পেপারটাতে অনেকে গত পরিক্ষায় কম লিখেও অনেক ভাল মার্কস পেয়েছে, আমিও সন্তোষজনক মার্কস পেয়েছি।

আসলে এই সিস্টেমটাকে অনেকেই কলা অনুষদের জন্য জটিল বা হাস্যকর ভাবলেও আসলে এই সিস্টেমটাই আমার মতে পারপেক্ট।

পরীক্ষা সিস্টেমগুলো হয়তো এত তারাতারি পরিবর্তন হবে না তবে আপনার মত চিন্তাভাবনারর কিছু লোকের সমন্বয় ঘটলে তা বাস্তবায়ন এর পথে এগিয়ে যাবে এবং বর্তমানের চেয়ে আরো ভাল শিক্ষা ব্যবস্থা পাওয়া যাবে।
ধন্যবাদ স্যার।

Salamat Ullah: মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে কোনো বিষয়ে গ্রেডিং সম্পূর্ণভাবে শ্রেণী শিক্ষকের হাতে। আমার দেখা, যে ক্লাসে আমিও একজন ছাত্র ছিলাম, মিড টার্ম এবং এসাইনমেন্ট, প্রজেক্ট ইত্যাদি শেষ হবার পরে শিক্ষক এক ছাত্রকে বললেন– তোমার ফাইনাল পরীক্ষা দেবার দরকার নাই। ফাইনাল পরীক্ষা না দিয়েই গ্রেড A। আসলে ঐ ছাত্রের ক্লাস পারফর্মেন্স সবচেয়ে ভাল ছিল। আসলে শুধুমাত্র প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে একজন ছাত্রের দক্ষতা কতটুকু তা যাচাই করা যায় না।

Mohammad Mozammel Hoque: শিক্ষককের নৈতিক মান ও মূল্যবোধের ব‍্যাপারটাই সবচেয়ে বড় কথা।

Ashique Rahman: আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি একটা আন্ডারগ্র্যাড কোর্স পড়াই, যেখানে ফাইনাল পরীক্ষা হচ্ছে অপশনাল। কেউ যদি প্রেসেনটেশন, ক্লাস পারফরমেন্স, উইকলি এসাইনমেন্টে খারাপ করে তাদের জন্য ফাইনাল এক্সাম। আরেকটা গ্রাজুয়েট কোর্স পড়াই, যেখানে মাত্র ৩৫% হচ্ছে ফাইনাল এক্সাম তাও আবার Take home exam. সিলেবাস প্রণয়ন এবং গ্রেডিং এ আমার স্বাধীনতা ১০০%।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

উচ্চশিক্ষা পদ্ধতির গলদ কোথায়?” শিরোনামের পোস্টটি একটি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

* চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক। আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।