জীবন ও জীবিকার পার্থক্য

Breadcrumb Navigation

একটুখানি ফিলোসফি: ০০১

এলাকার সব বাচ্চারা আমার বাসায় খেলতে আসে। বিকেল বেলা। নিয়মিত। সেরকম একটা মেয়ে শিশু। ক্লাস ফোর-ফাইভে পড়ে। সে আমাকে বললো, তার এইম ইন লাইফ হচ্ছে ডাক্তার হওয়া। বিশেষ করে, সে সার্জন হতে চায়। সেখানে আমার ছোট মেয়ে আর তার একজন বান্ধবী ছিল। ওরা ক্লাস নাইনে পড়ে। ক্লাস সেভেনে পড়ুয়া একটা মেয়েও সেখানে ছিল। সেভেনে পড়ুয়া মেয়েটিকে অ্যাড্রেস করে সবার উদ্দেশ্যে আমি এ ধরনের কিছু কথাবার্তা বললাম:

দেখো, রূহানার এইম ইন লাইফ হচ্ছে একজন সার্জন হওয়া। আমরা আশা করতে পারি তার বয়স যখন ২৫-২৬-২৭ হবে, অর্থাৎ ইন হার মিড টুয়েন্টিজের দিকে ও একজন সার্জন হয়ে যাবে। এতে করে তার জীবনের লক্ষ্য পূরণ হয়ে যাবে। তাহলে কি আমরা ধরে নেবো, তার বাদবাকি জীবনের কোনো লক্ষ্য থাকবে না? মিনিং থাকবে না?

তারা বলল, ডাক্তার হয়ে যাওয়ার পরও তার জীবনের লক্ষ্য বা তাৎপর্য, মিনিং অব লাইফ বলতে আমরা যা বুঝি, সেগুলো থাকবে। না হলে সে বেঁচে থাকবে কেন?

আমি বললাম, হ্যাঁ, তাই তো। মানুষের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, তাৎপর্য তথা মিনিং বলতে আমরা যা কিছু বুঝে থাকি সেগুলো আছে বলেই তো মানুষ বেঁচে থাকে, বেঁচে থাকার প্রেরণা পায়। তাই যদি হয় তাহলে দেখা যাচ্ছে, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর, সরকারি কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ী হওয়াটা কারো জীবনের লক্ষ্য হতে পারে না। এটি হতে পারে কারো জীবিকার লক্ষ্য বা choice of profession।

মেয়েদের বললাম– তাহলে তোমরা বুঝতে পারছো, জীবিকার লক্ষ্য আর জীবনের লক্ষ্য, দুইটা কিন্তু এক নয়।

এ পর্যায়ে আমার মেয়েটা বলে উঠলো– তাহলে কি আমাদের বইগুলোতে ‘what is your aim in life?’ হিসাবে যে প্রশ্ন করা হয় বা যা বলা আছে, সেগুলো কি ভুল?

আমি বললাম– তোমরাই বলো, কারো আয়-উপার্জনের বিষয়টিকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বলাটা সঠিক কিনা? তোমাদের যুক্তি কী বলে? বইয়ের কথা বাদ দাও। আমার কথাও বাদ দাও। তোমাদের কাছে কোনটা সঠিক মনে হয়, সেটাই তোমরা বলো।

তারা সবাই একটুখানি চিন্তা করল এবং বলল– জীবিকার লক্ষ্য এবং জীবনের লক্ষ্য, এ দুটো আসলে এক নয়। বইগুলোতে যেটা লেখা আছে সেটা ভুল।

তখন তাদেরকে আমি বললাম– দেখো, এই যে যুক্তি দিয়ে তোমাদেরকে একটা কথা আমি বুঝালাম, এটাই হচ্ছে ফিলোসফি। তোমাদের ‘মোজাম্মেল চাচা’ এই সাবজেক্টটাই পড়ান। ক্লাস নাইন আর সেভেনে পড়ুয়া মেয়ে দুটির বাবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জিওগ্রাফি ডিপার্টমেন্টের টিচার। সেই সুবাদে তাদেরকে বললাম–

দেখো, জিওগ্রাফি পড়া দরকার। কিন্তু তারচেয়েও বেশি দরকার ফিলোসফি সম্পর্কে জানা। যে যেই সাবজেক্টেই পড়ুক না কেন, জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে তার যদি কিছু জানতে হয়, তাহলে তাকে সেটা কোনো না কোনো যুক্তি দিয়েই ঠিক করতে হবে। আর বলাই বাহুল্য, জীবনের লক্ষ্য বা এ ধরনের কোনো মৌলিক বিষয়ে যুক্তি দিয়ে কিছু বলাটাই হচ্ছে ফিলোসফি।

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Jubairul Hasan Arif: স্যার, এভাবে আপনি পোলাপানের মাথা নষ্ট করে দিচ্ছেন। যে অজুহাতে সক্রেটিসরে হেমলক খাইতে হৈছিল। 😀

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: প্রতিদিন আমি ফিলোসফি নিয়ে কারো না কারো সাথে কিছু না কিছু কথাবার্তা বলি। বলা যায় এটি আমার এক ধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। I have been equipped with such capacity that I can convince anyone if they just give a little attention. আলহামদুলিল্লাহ

Nil Hansel: বর্তমানে যুক্তি দিয়ে জীবন চলে না, জীবন চলে জীবিকা দিয়ে। ফিলোসফির ভাষায় কী বলে?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: “… যুক্তি দিয়ে জীবন চলে না, জীবন চলে জীবিকা দিয়ে। ফিলোসফি কী বলে?” – এটাও তো একটা যুক্তি বটে। এর মানে হলো আমরা শেষ পর্যন্ত কিন্তু যুক্তি থেকে বের হতে পারলাম না। তার মানে হলো, ‘ফিলোসফির দরকার নাই’ এই কথাটা বলার জন্যও ফিলোসফিক্যাল আর্গুমেন্টেটিভ প্রসেসে যেতে হয়। কী অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না?

‘জীবন চলে জীবিকা দিয়ে’ – এটি অত্যন্ত স্থূল কথা। এই কথার মতো যে কেউ বলতে পারেন, ‘পেট ঠিক তো মাথা ঠিক’। আমরা সবাই একমত হবো যে, পেট খালি থাকলে মাথা কাজ করে না। কিন্তু এর মানে এই নয়, পেট এবং মাথা দুটো একই জিনিস বা সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অথবা আমরা এটাও মনে করব না যে, মাথার চেয়ে পেটের গুরুত্ব বেশি। অথবা আমরা এটাও মনে করব না, কারো উদর তার মস্তিষ্ককে পরিচালনা করে। যদিও সেটা প্রত্যেকের ক্ষেত্রে ক্ষেত্রবিশেষে প্রযোজ্য হতে পারে। অর্থাৎ যখন কারো প্রচণ্ড ক্ষুধা থাকবে সেটা তার মন-মানসিকতাকে প্রভাবিত করে বা করতেই পারে।

কিন্তু এর থেকে যদি কেউ এই অনুমান করে যে, মানুষের জৈববৃত্তি তার বুদ্ধিবৃত্তিকে পরিচালনা করে, তাহলে সে ভুল করবে। কেননা, আমরা জানি, মানুষের জৈববৃত্তি কখনো কখনো তার বুদ্ধিবৃত্তিকে প্রভাবিত করলেও মানুষ মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণী। বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে সে জৈবিক এবং অপরাপর যে কোনো ফ্যাকাল্টিকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে।

এভাবে আমরা জীবন ও জীবিকার ব্যাপারে বলতে পারি, জীবনের জন্য জীবিকা গুরুত্বপূর্ণ বটে, কিন্তু জীবন ও জীবিকা দুটি আলাদা জিনিস। they are necessarily connected, but not identical entities. জীবিকার জন্য জীবন নয়। বরং জীবনের জন্য জীবিকা। যদিও আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যাপারটা চলছে উল্টো রকমে। সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

*****

১৯ নভেম্বর, ২০১৮ তারিখে লেখাটি ফেসবুকে শেয়ার করার সময় প্রদত্ত ফরোয়ার্ডিং

জীবিকার উপায় কি জীবনের লক্ষ্য হতে পারে?

[কিছু কিছু বুদ্ধিজীবীকে আমি শিক্ষক হিসাবে মানি। এর মধ্যে অনেকেই আদর্শগতভাবে আমার বিরোধীপক্ষ। তাদেরকে শিক্ষক হিসাবে মানার কারণ হলো তাদের কাছ হতে আমি অনেক কিছু শিখেছি। প্রেরণা পেয়েছি। একেকজনের কাছ হতে একেকটা কিছু শিখেছি। এখানে তাদের নামোল্লেখ করা ততটা জরুরি নয়। তারা আমার শ্রদ্ধেয়। তাদেরকে ক্ষেত্রবিশেষে সাপোর্ট করে, ক্ষেত্রবিশেষে অপোজ করে আমি শক্তি সঞ্চয় করি। নিজের বিদ্যা-বুদ্ধি শান দেই। কথায় বলে, বেকুব বন্ধুর চেয়ে বুদ্ধিমান শত্রুর সান্নিধ্য উপকারী বেশি।

বুঝতেই পারছেন, এই লেখাটি অস্তগামী খ্যাতিসম্পন্ন বিখ্যাত স্যারের ‘একটুখানি বিজ্ঞান’ সিরিজ দ্বারা উদ্বুদ্ধ। বর্তমান যুগে বাতিল দর্শনকে বিজ্ঞানের মোড়কে ফেরি করা হচ্ছে। তাই ‘একটুখানি বিজ্ঞানের’ মতো ভাবছি ধারাবাহিকভাবে ‘একটুখানি ফিলোসফি’ চর্চা শুরু করবো। ইনশাআল্লাহ।]

ফেসবুক ফরোয়াডিংয়ে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Muhammad Moinul Islam: আপনার লেখা অনেকদিন ধরেই পড়ি, ভালো লাগে, তবে কমেন্ট করা হয় না। আমি একসময় ইয়েস্তিন গার্ডারের ‘সোফির জগত’ পড়েছি। সেই সময় থেকে ধর্ম আর চিন্তাবিদদের মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত সারমর্ম জানতে ইচ্ছা করে। জানতে ইচ্ছা করে দাসত্ব না স্রষ্টার খলিফা হওয়া মানুষের কাজ, নাকি আল্লাহর রঙ্গে রঙ্গীন হওয়া? আপনার কাছ থেকে যদি সোফির জগতের একটা ইসলামী সংস্করণ পাওয়া যেতো, তাহলে অনেক ভালো লাগত। ধন্যবাদ আপনাকে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক:  আমরা তো জীবনভর সংগঠন করে আত্মতুষ্ট থেকেছি। নিজেকে কখনো বুদ্ধিজীবী হিসেবে গড়ে তোলার দরকার মনে করি নাই। কখনো ভাবি নাই লেখা দরকার, লেখক হওয়া দরকার। অনেক বিলম্বে ২০১০ সাল থেকে লেখা শুরু করেছি। অথচ শিক্ষক হয়েছি সেই ১৯৯৩ সালে। যাই হোক, লেইট ইজ বেটার দ্যান নেভার। দোয়া করবেন।

Saidul Hoque: আপনার লিখা গত শুক্রবার থে‌কে পড়া শুরু ক‌রে‌ছি। ভা‌লোই লাগ‌ছে। আমি দেরিতে হ‌লেও আপনার সা‌থে ফেইসবু‌কে এড হ‌তে পে‌রে‌ছি। আপনা‌কে ধন্যবাদ। আপ‌নি দর্শন‌কে যেমন পেশা হি‌সে‌বে নি‌য়ে‌ছেন ঠিক তেম‌নি অন্তর থে‌কেও ভা‌লোবাস‌তে পে‌রে‌ছেন। এতটুকু‌তে ক্ষান্ত হন‌নি। নিরলসভা‌বে এগিয়ে যা‌চ্ছেন দার্শ‌নিক জ্ঞান‌কে সক‌লের কা‌ছে পৌঁছে দি‌তে। আমার জানা ম‌তে দর্শ‌নের একজন শিক্ষক হি‌সে‌বে আপ‌নিই ব্যতিক্রম। যতটুকু বু‌ঝি তা‌তে এইটুকু মা‌নি এবং মান‌তে হ‌বে সকল‌কে– দর্শ‌নের ক্ষেত্র আন‌লি‌মি‌টেড। কিন্তু কী হ‌বে আমা‌দের দি‌য়ে, আমরা যেখা‌নে আজ নৈ‌তিকতা বিবর্জিত, যেখা‌নে আমরা আজ সত্য অর্জ‌নে পথভ্রষ্ট, আমরা কী ক‌রে এই মহামূল্যবান গ্রন্থ‌কে মূল্য দেবো! আমরা যেখা‌নে আমা‌দের বাবা‌কে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাই সেখা‌নে আমা‌দের জ্ঞান, নৈ‌তিকতা কোথায় দাঁড়া‌চ্ছে? আমার ম‌নে হ‌চ্ছে, আমরা যারা তথাক‌থিত জ্ঞানী ব‌লে দাবি কর‌ছি তারাও দর্শন‌কে আজ বৃদ্ধাশ্রমে পাঠা‌নোর পায়তারা কর‌ছি।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ভালো হতে গেলে দর্শন লাগবে। খারাপ হওয়ার উপায় পথ ও পদ্ধতি এবং সেটার যৌক্তিকতাও মানুষ দর্শন থেকেই নিয়ে থাকে। দর্শন হচ্ছে একটি উন্মুক্ত ক্ষেত্র। আপনি যেভাবে চাইবেন সেভাবে এটাকে ব্যবহার করতে পারবেন।

এতদিন পর্যন্ত ইসলামী আদর্শের অনুসারী কেউ দর্শনকে তেমনভাবে আপন করে নেয়নি বা সেটাকে ব্যবহার করার জন্য উদ্যোগী হয়নি। এটি একটি দুঃখজনক ব্যাপার। আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় দেখেছি, ইসলাম ও দর্শন, এই দুইয়ের সম্মিলন হলে সেটি হতে পারে একটি ফ্যান্টাস্টিক জিনিস। এই স্বাদটা আমি পেয়েছি, এবং অন্যদেরকেও আমি এই ফ্লেভারটা দিতে আগ্রহী।

philosophy is not merely a profession to me. it’s a passion for me, actually.

ফেসবুক ফরোয়াডিংয়ের লিংক

One Reply to “জীবন ও জীবিকার পার্থক্য”

  1. স্যার , জীবনের লক্ষ্য জানতে ও বুঝতে হলে কি ফিলোসফি পড়তে হবে , নাকি ফিলোসফিতে ভাবতে হবে ।
    আর জীবনের লক্ষ্য কি আমরা ঠিক করে নেই , নাকি ঠিক করে দেওয়া হয় ।
    .
    .
    একজনের ইচ্ছা প্রেসিডেন্ট হওয়া ,কিন্তু সেটা জীবিকার জন্য নয় । তাহলে কী জীবনের এইম প্রেসিডেন্ট হওয়া ? নাকি অণ্য কিছু ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

* চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক। আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।