বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানসম্পন্ন পাঠদান

শিক্ষকদের করণীয়:

1. command on the topic: কোর্স শুরুর পূর্বেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ব্যাপক অধ্যয়ন ও গবেষণার মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করা। ক্লাসে যাওয়ার আগে পুরো বিষয়টি ভালো করে রিভিউ করে নেয়া।

2. regularly attending classes: নিয়মিত ক্লাস নেয়া, সময়মত ক্লাসে আসা, পূর্ণ সময়ে ক্লাসে থাকা ও ক্রেডিট আওয়ার পূর্ণ করার মাধ্যমে কোর্স শেষ করা।

3. course materials: সংশ্লিষ্ট টেক্সট ও আর্টিকেলসহ সিলেবাসে উল্লেখিত কোর্স ম্যাটেরিয়ালস এভেইলেবল কিনা তা নিশ্চিত হওয়া এবং কোর্সের শুরুতে সবাই সেগুলো পেয়েছে কিনা তা যাচাই করে নেয়া।

4. lecture schedule: কোন দিন, কোথা থেকে, কী পড়ানো হবে, তা আগেভাগে জানিয়ে দেয়া।

5. lecture synopsis: প্রত্যেক স্টুডেন্টের কাছে আজকের ক্লাসের লেকচার সিনোপসিস বা হ্যান্ড-আউট আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা।

6. positive to questions: ক্লাসে স্টুডেন্টদের নির্ভয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়া। কোনো স্টুডেন্ট প্রশ্ন করার পরে লেকচার থামিয়ে প্রশ্নটিকে গ্রহণ করা ও কনভেনিয়েন্ট সময়ে সেটার উত্তর দেয়া। ভুল প্রশ্নের ক্ষেত্রে, কেন সেটি ভুল বা অপ্রাসঙ্গিক তা সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয়া।

7. group discussion: প্রতি ক্লাসে কমপক্ষে ১টা ও সর্বোচ্চ ৩টা গ্রুপ ডিসকাসশন করা। চলমান আলোচনা হতে কন্ট্রোভার্শিয়াল বা ডিসপিউটেড কোনো বিষয়ে কে কী মনে করে বা কোন দৃষ্টিভঙ্গি হতে সে এ বিষয়টিকে দেখে তা নির্ধারণ করার জন্য কাছাকাছি বসা স্টুডেন্টদের নিয়ে গ্রুপ করে দেয়া। স্টুডেন্টরা ৪-৫ মিনিট উক্ত বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে। এরপর তাদের গ্রুপ হতে একজন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতামত তুলে ধরবে। এভাবে স্টুডেন্টদের বিভিন্ন গ্রুপ হতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতামত দেয়ার মাধ্যমে একটি সংক্ষিপ্ত ও প্রাণবন্ত বিতর্ক জমে উঠবে। অবশেষে শিক্ষক মহোদয় বিষয়টির সুরাহা করে পরবর্তী আলোচনা শুরু করবেন।

8. connection, summary and continuity: ক্লাসের শুরুতে পূর্ববর্তী ক্লাসের অতিসংক্ষিপ্ত রিভিউ করার মাধ্যমে পূর্ববর্তী আলোচনার সাথে স্টুডেন্টদেরকে সংযুক্ত করা। ক্লাসের শেষের দিকে পুরো ক্লাসের পয়েন্টগুলোকে ও পরবর্তী ক্লাসের বিষয়বস্তুকে স্মরণ করিয়ে দেয়া।

9. lecture recording: ছাত্র-ছাত্রীরা লেকচারের অডিও-ভিডিও রেকর্ড নিতে চাইলে তাতে সহযোগিতা করা।

10. explanation, review and learning: ক্লাসের আলোচ্য বিষয়কে (১) উপস্থাপনা, (২) পর্যালোচনা ও (৩) শেষ পর্যন্ত কী হলো বা কী পেলাম, এই তিনভাগে ভাগ করে নেয়া। পাঠদানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোর্স ম্যাটেরিয়েলে যেসব ডিসকাসশন-পয়েন্ট আছে তা উপস্থাপন করা ও যথাসম্ভব বুঝিয়ে দেয়া। এরপর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষক মহোদয় নিজস্ব বক্তব্য যুক্তি সহকারে তুলে ধরবেন। এসব কিছুর লক্ষ্য হবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্টুডেন্টদেরকে নিজস্ব অভিমত ও অবস্থান গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা।

11. levelling the students: রেসপন্স, অবজারভেশন ও ফলাফলের ভিত্তিতে একটি ক্লাসের সব স্টুডেন্টদেরকে ভালো, মাঝারি ও দুর্বল, এই তিন ভাগে অঘোষিতভাবে ভাগ করে নেয়া। প্রত্যেক লেভেলের স্টুডেন্টদের জন্য ক্লাসের মধ্যে কন্টেন্ট থাকতে হবে। অর্থাৎ ক্লাসের কিছু আসপেক্ট হবে উন্নতমানের। কিছু হবে মাঝারি মানের এবং কিছু আসপেক্ট বা কন্টেন্ট দিতে হবে দুর্বলদেরকে খানিকটা টেনে তোলার জন্য।

12. assessment literacy: ‘তারা কী কী জানে না’ তা যাচাই করার পরিবর্তে ‘সংশ্লিষ্ট কোর্সে অংশগ্রহণকারীরা কতটুকু কী জানে, বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাদের সত্যিকারের অগ্রগতি কতটুকু’ তা যাচাই করার জন্যই পরীক্ষা পদ্ধতি, এটি স্মরণে রেখে প্রশ্নপত্র তৈরী ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজে অধিকতর যত্নবান হওয়া।

13. friendly behavior: ক্লাসের অভ্যন্তরীণ পরিসরে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করা, ক্লাসের বাইরেও সুবিধামত সময়ে তাদের একাডেমিক প্রশ্নকে এন্টারটেইন করা, তাদের বিশেষ কোনো অসুবিধার বিষয়ে সহমর্মী হওয়া, সবার প্রতি সম ভাল ব্যবহার ও ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করা, পাঠ মূল্যায়নে কঠোরভাবে নিরপেক্ষ ও উদার থাকা।

14. curriculum & syllabus update: সম্ভব হলে প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে কোর্স কিংবা কোর্স-কন্টেন্ট পরিবর্তন করা। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একাডেমিক অগ্রগতির সাথে নিজেকে আপডেট রাখা এবং কোর্স ম্যাটেরিয়াল ও লেকচার সিনোপসিসের মধ্যে সেগুলো ইনক্লুড করা।

15. guardianship: নিজেকে ইনস্ট্রাক্টর ও মেন্টরের মাঝামাঝি পর্যায়ে একজন মোরাল এজেন্ট হিসেবে বিবেচনা করা। এর দাবি হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের মূল্যবোধ, ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা ও কমিউনিকেটিভ স্কিলের উন্নয়নে তাদেরকে যথাসম্ভব সহায়তা করা।

16. self-development: সংশ্লিষ্ট কোর্সে অংশগ্রহণকারীগণ এবং/অথবা সহকর্মীদের সহায়তা নিয়ে এবং/অথবা আত্মপর্যালোচনা মাধ্যমে নিজের পাঠদান দক্ষতার উন্নয়নের প্রতি খেয়াল রাখা। ‘Am I a better teacher today?’ নিজেকে সব সময় এই প্রশ্নের আওতাধীন হিসেবে বিবেচনা করা।

উপরোক্ত করণীয়সমূহকে উপেক্ষা ও অবহেলা করা কিংবা এগুলোর বিপরীত আচরণ করা একজন আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের জন্য অবশ্য বর্জনীয়। এরই সাথে নিম্নে উল্লেখিত নেতিবাচক বিষয়গুলোকেও বর্জন করা জরুরী।

শিক্ষকদের বর্জনীয়:

1. roll call system: ক্লাসে রোল নম্বর ধরে ধরে হাজিরা নেয়ার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট করা। ক্লাসে স্টুডেন্টদের উপস্থিতি সম্পর্কে রেকর্ড রাখার জন্য অন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। যেমন, পারসেন্টেইজ শীট কিংবা অটোমেইটেড সিস্টেম।

2. unnecessary behavioral bindings: ক্লাসে প্রবেশ ও নির্গমনে অনুমতি নেয়ার বাধ্যবাধকতা বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। কিছু বলার সময়ে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখানোর রীতি চালু বা বহাল রাখার মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক পাঠদান পদ্ধতির পরিবর্তে গুরুবাদী শিক্ষাব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়া।

3. passive learning system: ক্লাসে আলোচনার মূল্যবান সময়ে এমন কিছু লিখতে বাধ্য করা যা লেকচার হ্যান্ড-আউট বা বইয়ের মধ্যে আছে এবং তা সহজেই খুঁজে নেয়া সম্ভব। অথবা, ক্লাসে প্রয়োজনীয় পয়েন্ট টুকে নেয়ার সুযোগ না দিয়ে একনাগাড়ে শুনতে বাধ্য করা।

4. excessive use or no use of white board: ক্লাসে এসে আলোচনার পরিবর্তে অধিকাংশ সময়ে বোর্ডে লিখতে থাকা কিম্বা একেবারেই বোর্ড ইউজ না করে একটানা বক্তৃতা দেওয়া।

5. reading text or note: টেক্সট বা নোটে একটু চোখ বুলিয়ে নিয়ে আলোচনা কন্টিনিউ করার পরিবর্তে হাতে থাকা বই বা নোট থেকে একটানা পড়তে থাকা।

6. gossiping and/or red herring fallacy: ক্লাসে এসে ব্যক্তিগত বিষয়ে বা অপ্রাসঙ্গিক একাডেমিক বিষয়ে আলাপ ও গল্প জুড়ে দেয়া।

7. sound problem: low voice or shouting or high pitch sound system: ক্লাসে খুব নিম্ন স্বরে কথা বলা, কিংবা উচ্চস্বরে চেঁচাতে থাকা, কিংবা কানে লাগে এমন লাউড স্পিকার ব্যবহার করা।

8. personality problem: nervousness, aggressiveness, irritating perfume, inappropriate dress, friendship & ridiculing: ক্লাসে নার্ভাস হয়ে পড়া, অথবা ক্ষিপ্ত হয়ে থাকা। উগ্র পারফিউম ব্যবহার করা কিংবা অনাকাংক্ষিত পোশাক পরিধান করা। বিশেষ বা কতিপয় স্টুডেন্টদেরকে অতিরিক্ত খাতির করা বা হেয় প্রতিপন্ন করা।

9. giving suggestion & coaching centre type teaching: যেসব প্রশ্ন পরীক্ষায় আসবে সেগুলোই শুধু পড়ানো, সাজেশন দেয়া কিংবা সাজেশন মোতাবেক পাঠদান। তাদেরকে পরীক্ষায় ভাল গ্রেড পাইয়ে দেয়ার লক্ষ্যে কোচিং সেন্টারের মতো করে নোটভিত্তিক পাঠদান। বেশি বেশি করে মুখস্ত করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা।

10. indoctrination: সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটানোর ব্যাপারে সচেষ্ট হওয়ার পরিবর্তে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    * চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক। আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।