এশুর ছেলে সুন্দর আলীর সাথে আজ সকালে ভালো-মন্দ নিয়ে একটুখানি দর্শন চর্চা

ফেরেশতা দেখেছো?

না তো। ফেরেশতা কি দেখা যায়?

হ্যাঁ, অবশ্যই দেখা যায়। এই যে দেখতে পাচ্ছি।

তাই নাকি? কোথায়?

এই যে তোমাকে দেখতে পাচ্ছি। তোমরা, মানে বাচ্চারা তো ফেরেশতার মতোই। তুমি কি জান না, বাচ্চারা নিষ্পাপ? তাদের কোনো গোনাহ নাই?

হ্যাঁ, জানি।

তাহলে …। যাদের কোনো পাপ নাই, যাদের সব কাজই ভালো, তারাতো ফেরেশতার মতোই নিষ্পাপ। হ্যাঁ, তারা ভুল করতে পারে। তাই বলে তারা দোষী নয়। তার মানে ভুল করা এক জিনিস আর দোষ করা, মানে অপরাধ করা আর এক জিনিস। বাচ্চাদের ভুল হতে পারে। হতে পারে, তারা বুঝতে পারছে না। তাই ভুল বুঝছে।

যেভাবে ফেরেশতারাও ভুল করার কাহিনী কোরআন শরীফে বলা আছে।

ফেরেশতারা যদি ভুল করে তাহলে ফেরেশতা হলো কীভাবে? তারা তো যা বলা হয় তাই করবে? কোনো উল্টাপাল্টা করার কথা না…!

হ্যাঁ, ফেরেশতাদের যা করতে বলা হবে তারা তাই করে। কোনো উল্টাপাল্টা করার কথা তারা ভাবতেই পারে না। কারণ, তারাতে আদতে খুব একটা ভাবতেও পারে না। এখনকার রবোটের মতো। তাদের আছে দক্ষতা।

জ্ঞান হলো মানবিক ব্যাপার। অনুভূতি থাকা মানেই ভাবতে পারা অর্থাৎ চিন্তাশীল হওয়া বুঝায় না। মানুষ ভাবতে পারে। উল্টাপাল্টা ভাবতে পারে। তাই মানুষ সৃষ্টিশীল।

যেমন, আল্লাহ স্বয়ং সৃষ্টিশীল। আমাদের যেমন করে কোনো কিছুর দরকার পরে, সেভাবে আল্লাহর তো দরকার ছিলো না, জগত সৃষ্টি করার। অথচ, তিনি জগত সৃষ্টি করলেন।

এই যে লজিকের বাইরে যাওয়া, এটাই তো সৃষ্টিশীলতা বা সৃজনশীলতার মূল জিনিস।

লজিক কী?

ওহ, লজিক হচ্ছে যুক্তি। তারমানে, যেটা থেকে যেটা বুঝা যায়। বা, যেটা হতে যেটা বের হয়। অথবা, যেটা করলে বা হলে, তার মতো করে নির্দিষ্ট অন্য কিছুও হতে হয় বা করতে হয়। না হলে আমাদের কাছে সেটা ঠিক মতো হইছে বলে মনে হয় না।

আচ্ছা, এইটারে বলে লজিক। তো, লজিকটা আমাদের মধ্যে কোত্থেকে আসলো?

লজিক বা যুক্তিবোধটা কোত্থেকে আসলো তা কিন্তু আমরা যে লজিক বা যুক্তিবোধকে ব্যবহার করি তার মধ্যে বলা নাই। আমরা বুঝতে পারি, কেউ আমাদের মধ্যে এই ধরনের বিচার-বিবেচনাবোধ, যাকে আমরা যুক্তিবোধ বা লজিক বলছি, তা দিয়ে দিছে। সেইটা ‘প্রকৃতি’ হইতে পারে, ঈশ্বর হইতে পারে।

বুঝলাম। তো, প্রকৃতি আর ঈশ্বরের মধ্যে সম্পর্ক কী? আমি বলতে চাচ্ছি, প্রকৃতি থাকলে ঈশ্বরের দরকারই বা কী? আচ্ছা, কোন কোনে জিনিস কীভাবে থাকলে প্রকৃতি হবে?

এই তোমার তো দেখছি অনেক অনেক প্রশ্ন। একসাথে সব প্রশ্নের জওয়াব দেয়া যাবে না। আজ আমরা যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম তার মধ্যেই থাকি।

ওহ, ফেরেশতারা ভুল করা সত্বেও, বলছিলেন, তারা নিষ্পাপ।

তুমি এটা জানো না? আল্লাহ তায়ালা যখন ফেরেশতাদের বললেন, দুনিয়াতে তিনি মানুষ সৃষ্টি করবেন। তখন ফেরেশতারা বললো, তারা তো রক্তপাত ঘটাবে। দুনিয়াতে হাঙ্গামা করবে। বিপর্যয় ঘটাবে। আপনার ইবাদাত করার জন্য আমরা ফেরেশতারাই কি যথেষ্ট নই?

তখন আল্লাহ তায়ালা কী বললেন? তিনি বলেছেন, আমি এ ব্যাপারে যা জানি তোমরা তা জানো না।

তারমানে, দুনিয়াতে মানুষ সৃষ্টির ব্যাপারে ফেরেশতাদের ধারণা ভুল ছিলো। আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করা অর্থাৎ খলীফা হিসাবে মানুষের দায়িত্ব কর্তব্য ও মর্যাদা সম্পর্কে ফেরেশতাদের ধারণা ভুল ছিলো। এ জন্য তারা দোষী নন। এটি তাদের চিন্তাগত সীমাবদ্ধতা। তারা একটু আগে যেমনটা বললাম, রোবটের মতো কাজে দক্ষ, কিন্তু মননশীলতা, চিন্তা ও সৃজনশীলতায় তারা অপারগ। প্রথম মানুষ আদম (আ.) কে সেজদা করার জন্য আল্লাহ তাদেরকে বলেছেন তাই তারা তা করেছেন।

জ্বীন জাতির অন্তর্ভূক্ত হওয়ার কারণে ইবলিস উল্টাপাল্টা চিন্তা করেছে। সে যুক্তি প্রয়োগ করেছে।

সে ভেবেছে, মানুষকে তো আল্লাহ তায়ালা মাটি হইতে বানাইছে। আর জ্বীনদেরকে তো আগুণ হইতে বানাইছে। তার ধারণায়, আগুণ মাটি হইতে উত্তম। তাই, সে নিজেকে আদমের (আ.) চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করেছে। এই চিন্তার কারণে সে আল্লাহর হুকুম মানতে অস্বীকার করেছে।

আদমও (আ.) একই ভুল করেছে। আল্লাহ তায়ালা প্রথম মানুষ আদম (আ.) এবং তার সঙ্গীনি হিসাবে হাওয়া (আ.)কে সৃষ্টি করে বেহেশতের মধ্যে থাকার জন্য দিলেন। সব কিছু তারা ভোগ করতে পারবে। শুধুমাত্র একটা নির্দিষ্ট গাছের কাছে যেতে পারবে না। এটুকু বলে দিলেন।

শারীরিক অনুভূতির অতিরিক্ত ইচ্ছাশক্তি বা চিন্তার স্বাধীনতার কারণে আদম (আ.) আল্লাহ হুকুমকে অমান্য করে ওই গাছের কাছে গেছেন। আর কী কী করছেন, মানে ফল খাইছেন কিনা, বা সেইটা কি আদৌ ফলজ গাছ ছিলো কিনা, তা আমরা জানি না। জানার দরকারও নাই।

মূল কথা হলো, আদমও (আ.) আল্লাহর হুকুম অমান্য করছেন। ইবলিসের সাথে আদমের (আ.) পার্থক্য হলো ইবলিস নিজের চিন্তার গোলক ধাঁধাঁর মধ্যে বাঁধা পড়ে ছিলো। কিন্তু উন্নততর চিন্তাশক্তি থাকার কারণে আদম (আ) নিজের চিন্তাশক্তির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বুঝতে পেরেছিলেন। সত্যিকারের জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার কারণে তিনি বিণয়ী হয়েছিলেন। নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছিলেন।

আপনি বললেন আদম (আ.) নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। তাহলে ফেরেশতাদের ভুলের সাথে আদমের (আ.) ভুলের পার্থক্য কী?

ফেরেশতারা নিজেদের ভুল বুঝতে পারে না, যেভাবে মানুষ নিজের ভুল বুঝতে পারে। মানুষ ভুল যে ভুল তা হৃদয়ঙ্গম করে। মনের গভীর অনুভূতি দিয়ে বুঝতে পারে। এবং সে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। অর্থাৎ নিজেকে সে সংশোধন করে। তাই, ভুলের ওপর জিদ করে থাকা মানবিক আচরণের পরিপন্থী।

নিজের ভুল বুঝতে না চাইলে, বুঝলেও বা কেউ বুঝিয়ে দেয়ার পরেও তা স্বীকার করতে না চাইলে মানুষের ওই ভুলটাকে অপরাধ হিসাবে সাব্যস্ত করা হবে।

এবার বুঝতে পারছো বাচ্চাদেরকে কেন আমি ফেরেশতার মতো বলছি?

ফেরেশতারা যেভাবে ভালো বাচ্চারাও সেভাবে ভালো। আসলে তাদের খারাপ হওয়ার সুযোগই নাই। যার খারাপ হওয়ার বা দোষণীয় কিছু করার স্বাধীনতা আছে শুধুমাত্রই সেই আসলে সত্যিকারের ভালো হতে পারে। দুনিয়ার সব কিছুই আদতে ভালো। তেমন কিছু না জানার কারণে জ্বীনদেরকে বাদ দিলে, শুধুমাত্র মানুষের পক্ষেই তাই সত্যিকারের ভালো বা খারাপ হওয়া সম্ভব।

[এশু আমাদের দশ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। এরশাদুল হক। আমি মাঝে মাঝে ওকে এশু বলে ডাকি। ওর ছেলে আদনান মাহবুব। চট্টগ্রাম সেনানিবাস উচ্চ বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। আদর করে আমি ওকে সুন্দর আলী বলি। বয়সের তুলনায় মাশাআল্লাহ যথেষ্ট বুদ্ধিমান। মাঝে মাঝে ও সহ অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে ফিলোসফি নিয়ে অনেক কথা বলি। তাদের মতো করে। তারা অনেক খানি বোঝে। ভাবছি, সেগুলো নিয়ে মাঝে মধ্যে কিছু কিছু লিখবো।]

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক।