ইসলাম ও দর্শন: প্রচলিত ভুল ধারণার সংশোধন

ইসলাম ও দর্শন: প্রচলিত ভুল ধারণার সংশোধন

রাসূল (সা) কীভাবে ওহী পেয়েছেন?

ইসলাম হলো দার্শনিকতার উৎকৃষ্টতম ফসল। দর্শনের মূলকথা হলো ইসলাম। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, সব ব্যাপারে মূল হলো আল-ইসলাম, নামাজ হলো এর ভিত্তি এবং জিহাদ এর চূড়া। রাসূল (সা) যখন হেরা পর্বতের গুহায় ‘ধ্যান’ করতেন, তখন আসলে তিনি সেখানে কী করতেন? নিশ্চয়ই আমরা এখন যেভাবে বুঝি সেভাবে তিনি জিকির-মোরাক্বাবা করতেন না। সেখানে তিনি ঘুমাতেও যাননি। পালিয়েও থাকেননি। দারুল আরকামের মতো একটি নিরাপদ স্থান হিসাবেও সেটিকে বেছে নেননি। তিনি ভাবছিলেন, গভীরভাবে, একটা সত্যিকারের জীবনাদর্শ কী হতে পারে, সত্য কী, ন্যায়ের চূড়ান্ত মানদণ্ড কী হতে পারে, মানুষের মুক্তির পথ কী, এ জগতের রহস্য কী, এর কন্টিনিউশন কী হতে পারে ইত্যাদি ধরনের সমস্যা বা প্রশ্ন নিয়ে। এক পর্যায়ে তিনি ওহী লাভ করেন। যার মধ্যে রয়েছে তাঁর আরাধ্য হেদায়েত বা দিকনির্দেশনা। রাসূল (সা) সত্যকে জানা ও পাওয়ার জন্য প্রচলিত ধ্যানধারনাকে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে স্বীয় যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে যাচাই করার চেষ্টা করে বুঝেছেন যা কিছু প্রতিষ্ঠিত তার অনেক কিছুই ঠিক নয়। সমাধান কী হবে, তা তিনি গভীরভাবে ভাবছিলেন। আল্লাহ তাঁকে নবুয়তের আলো দিয়ে পথনির্দেশনা দিয়েছেন। রাসূল হওয়ার কারণে তিনি ওহীপ্রাপ্তি পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছেন। সত্যকে পেতে চাইলে আমরা সাধারণ মানুষ হিসাবে ওহী পর্যন্ত পৌঁছতে পারবো না, ইতোমধ্যে ওহী এসে যাওয়ায় তার দরকারও নাই; তবে সত্যকে জানতে চাইলে যে কেউ তা খুঁজে পাবে। চূড়ান্ত ওহী পরবর্তী এই সময়কালের সত্যপ্রাপ্তি হচ্ছে ওহীর সত্যতা সম্পর্কে সন্তুষ্ট হওয়া, ওহীর সত্যতাকে খুঁজে পাওয়া।

কুরআন কীভাবে মানুষকে ডাকে?

কুরআন মানুষকে বলে চিন্তা-গবেষণা করতে। যেসব বিষয়কে পেরিনিয়্যাল প্রবলেম হিসাবে চিহ্নিত করা হয় সেসব সম্পর্কে জানতে, যাচাই করতে উৎসাহিত করে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনের পাতায় পাতায় যুক্তি দিয়ে মানুষকে বলেছেন, যদিও পরম হিসাবে তিনি শুধু করণীয় সম্পর্কে হুকুম নাযিল করলেও তা বাধ্যতামূলক হতো। আল্লাহ তায়ালা স্বীয় রাসূলের মাধ্যমে দেখিয়েছেন নিদর্শন তথা আয়াত, যা যুক্তিবুদ্ধি তথা বিবেক-জ্ঞান দিয়ে খুঁজে নিতে হয়। জ্ঞানচর্চাকে, বুদ্ধির অনুশীলনকে প্রপাগেইট করা হয়েছে নিয়মিতভাবে। ঈমান বা বিশ্বাস হলো বুঝজ্ঞান অনুসারে পাওয়া একটা সিদ্ধান্ত বা উপসংহার। না বুঝে বিশ্বাস করার কোনো মূল্য নাই।

আমাদের বোধ-জ্ঞান-বিবেচনা-যাচাইয়ের সীমা কতটুকু?

আমাদের বোধ-জ্ঞান-বিবেচনা-যাচাইয়ের সীমা যতটুকুই হোক তা শেষ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। এ বিবেচনায় শুধুমাত্র স্বীয় ব্যক্তিগত বুঝজ্ঞানের উপর নির্ভর করা অযৌক্তিক। আবার পরম সত্যকে পাওয়ার জন্য নিজ বুঝজ্ঞানকে বাদ দিতে হবে – এটিও অগ্রহণযোগ্য একটা প্রান্তিকতা। যখন আমরা ডাক্তারের কাছে যাই তখন তার প্রেসক্রিপশনের উপর আপাতদৃষ্টিতে আমি অন্ধভাবে বিশ্বাস করি বটে, কিন্তু তিনি ভালো ডাক্তার কিনা তা যাচাই করেই আমি তার কাছে যাই। দর্শন বিষয়ে উপরের আলোচনায় আমি বলেছি– যখনই আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নেই তখন আমরা যাচাই করেই সেই সিদ্ধান্ত নেই। আবার যাচাই করা মানে একেবারে প্রত্যক্ষ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে যাচাই করা নয়। আমরা যুক্তি ও সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করি। যখন আমরা চোখে দেখি তখনও আমরা চোখের সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করি।

রাসূলকে রাসূল হিসাবে গ্রহণ করতে হলে বুঝজ্ঞান লাগবে। রেসালতের সত্যতায় নিশ্চিত হওয়ার পর বাকিটুকু বিশ্বাসের বিষয়। এবং এটিই যৌক্তিক। ব্যবহারিক জীবনে কোনো এক্সপার্টের বিষয়ে আমরা যা করে থাকি। গাড়ির ড্রাইভার হতে শুরু করে ডাক্তার পর্যন্ত সবার সাথে। সর্বদাই আমরা স্বীয় বুঝজ্ঞানের উপর থাকি, এমনকি যখন আমরা কাউকে কোনো বিষয়ে আমাকে গাইড করার উপযুক্ত বিবেচনা করে তার নির্দেশনাকে বিনাবাক্যে গ্রহণ করি।

জ্ঞানতত্ত্ব ঈমান তথা ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব:

প্রচলিত পাশ্চাত্য জ্ঞানতত্ত্ব হলো দ্বন্দ্ববাদী। ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা বা বুদ্ধি – এ দুটি পক্ষ। কারো মতে, ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা যে জ্ঞান দেয় সেটি অপরাপর যে কোনো জ্ঞানের চেয়ে অধিকতর গ্রহণযোগ্য জ্ঞান। আবার বুদ্ধিবাদীদের মতে কখনো কখনো বুদ্ধির মাধ্যমে আমরা যে জ্ঞান পাই তা-ই সঠিক বা বেটার নলেজ। পাশ্চাত্যের কেউ কেউ স্বজ্ঞার কথা বলেছেন বটে, তবে তারা স্বজ্ঞাকে যতটা সম্ভব সযতনে এড়িয়ে গেছেন। কমনসেন্স নামে কেউ কেউ একে বেনামে স্বীকার করেছেন। অন্যদিকে, ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব সমন্বয়বাদী। এর সর্বনিম্ন স্তর হলো ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা। এর উপরে বুদ্ধি। এর উপরে স্বজ্ঞা (ইলহাম)। স্বজ্ঞার পূর্ণতা তথা পারফেকশন হলো ওহী বা প্রত্যাদেশ। শুধুমাত্র নবীগণই জ্ঞানের এই সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পারেন। আমাদের জ্ঞানতত্ত্বে ওহীর পর্যায় হলো যৌক্তিক প্রকল্প। এবং একমাত্র যৌক্তিক ও বৌদ্ধিক (র‍্যাশনাল) সম্ভাবনা হওয়ার কারণে একে প্রমাণিত ও সত্য হিসাবে আমরা গ্রহণ করি। যদি প্রত্যাদেশকে স্বীকার করা না হয় তাহলে স্বজ্ঞার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা করা যায় না। মূলকথা হলো, আমরা যখন প্রত্যাদেশ-নিঃসৃত কিছু বিশ্বাস করি তখন আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি ও স্বজ্ঞার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই তা বিশ্বাস বা গ্রহণ করি। কেউ যদি তা সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে না করেন তখন তিনি নিজেকে অবিশ্বাসী হিসাবে আইডেন্টিফাই করলেন। বিশ্বাসী তথা ঈমানদারদের বেলায় জ্ঞানের এই চার স্তরের মধ্যে সামঞ্জস্যতার দিক থেকে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তেমনটি হলে তিনি ওহীর জ্ঞানকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি ও ওহীবহির্ভূত সব সূত্রকে পুনর্মূল্যায়ন করবেন। এতদসত্ত্বেও এ ধরনের মুমিনের অভিজ্ঞতা ও বুঝজ্ঞান তার জ্ঞানের উৎস হিসাবে বাতিল (নালিফাইড) হলো না। কারণ তিনি স্বীয় অভিজ্ঞতা ও বুঝজ্ঞানের মাধ্যমে প্রত্যাদেশকে সর্বোচ্চ মান হিসাবে পেয়েছেন ও গ্রহণ করেছেন। যেসব বিষয়ে কোনো ঐশী জ্ঞানের কথা সরাসরি বলা নাই, সেক্ষেত্রে তিনি নিজ অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধি মোতাবেক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এটি দ্বন্দ্ব নয়, সমন্বয়।

বিশ্বাসের যৌক্তিকতা স্বরূপ:

প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে প্লাটোর প্রস্তাবনা অনুসারে পাশ্চাত্য দর্শনে জ্ঞানের প্রচলিত সংজ্ঞা হলো knowledge is justified true belief. ১৯৬৩ সালের পর থেকে এই সংজ্ঞাকে মেরামত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেটি অন্য প্রসঙ্গ। মূলকথা হলো, বিশ্বাস ছাড়া জীবন অসম্ভব, সে বিশ্বাস যা-ই হোক না কেন। সকল জ্ঞানই মূলত বিশ্বাস হলেও বিশ্বাস মাত্রই জ্ঞান নয়। শুধুমাত্র সেসব বিশ্বাসই জ্ঞান হিসাবে গৃহীত হবে যা যাচাইকৃত ও সত্য হবে। এছাড়া শুধু বিশ্বাস স্পষ্টতই অন্ধ বিশ্বাস।

বিশ্বাস হলো যা জানি না তার সম্পর্কে নিশ্চিত হিসাবে কোনো কিছুকে স্বীকার করা – শুধুমাত্র এটুকু বললে ভুল বোঝা সম্ভব। আসলে বিশ্বাস হলো যা জানি তার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অজানা সম্পর্কে সর্বোত্তম ও যৌক্তিক অনুমান করে তা সত্য হিসাবে গ্রহণ করা। এভাবেই আমরা ‘গড অফ দ্য গ্যাপস’ নামক নাস্তিকতার যুক্তিকে খণ্ডন করতে পারবো। আল্লাহর সত্ত্বাকে আমরা জানি না বটে, তবে আমরা যা জানি সেসবের জ্ঞানগত যৌক্তিক পরিণতি হচ্ছেন আল্লাহ। আল্লাহ অস্তিত্ব অর্থহীন হয়ে পড়ে যদি রেসালতকে না মানা হয়। এ ধারায় সব কিছু যা ইসলামে আছে বা ইসলামের মূলকথা।

When the declaration of the Kalima is a rational conclusion then it is worthy enough. Mere utterance of Kalima is totally useless. Rationality, any sort of rationality is nothing but doing philosophy. Where any argument is not working, it has to be shown with healthy argument that why argumentation is not applicable there. Trust on and submission to authority(ies) is a must for our life to continue, no matter what is/are that/those authority(ies).

 

মূল লেখার ব্যাকআপ লিংক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *