দর্শন বনাম দার্শনিক অবস্থান

ফেসবুকে একজনের স্ট্যাটাস: দর্শনে আল্লাহখোঁজলে নাইপাইবেন। তখন আপনের নাস্তিক হতেই হবে। না হইলে আপনের মধ্যে সততা নাই।”

আমার মন্তব্য: এমন অদ্ভুত অবাস্তব কথা গত তিরিশ বছরের দর্শন চর্চায় পাই নাই।”

তিনি এর উত্তর দিলেন: না পাইলে সেই দায়িত্ব নিশ্চই আমি নেব না।”

আমার প্রতিমন্তব্য: দর্শন সম্পর্কে আপনার প্রাথমিক জ্ঞান-ই নাই। দেখছি।”

***

১.

হ্যাঁ, দর্শন বা ফিলোসফি সম্পর্কে একটা সাধারণ ভুল ধারণা হলো, অন্যান্য জ্ঞানশাখার মতো এটি কোনো বিষয়ে ‘একটা কিছু’ বা ‘প্রধান একটা কিছু’ বলে।

না, ফিলোসফি কোনো কিছু সম্পর্কে তেমন কিছু বলে না। বরং, কোনো বিষয়ে অপশন বা সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর পক্ষ-বিপক্ষ যুক্তিগুলোকে তুলে ধরে। দিন শেষে ব্যক্তি নিজ সিদ্ধান্ত নিজেই গ্রহণ করে। এই অর্থে, philosophy is not prescriptive, but descriptive.

ফিলোসফি আর ফিলোসফিক্যাল – এই দুইটা নোশনকে স্বতন্ত্রভাবে বুঝতে হবে।

দর্শন, বাই ডেফিনেশান মুক্ত, অবারিত। দার্শনিক বলতে যা বুঝায়, তা তার বিপরীত।

কোনো ব্যক্তি-দার্শনিক বা নির্দিষ্ট কোনো দার্শনিক অবস্থান কোথাও না কোথাও স্থিত। এর অন্যথা অসম্ভব।

উদাহরণ হিসাবে বললে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রসংগে এটি আস্তিকতা, নাস্তিকতা, সংশয়বাদ বা অজ্ঞেয়তাবাদ কিংবা নির্বিকারবাদের (irreleventism) যে কোনোটিই হতে পারে। স্বতন্ত্রভাবে এর প্রতিটাই ইকোয়ালি ফিলোসফিক্যাল।

আল্লাহ আছেন বলে যিনি মনে করেন তিনি আস্তিক। নাই মনে করলে তিনি নাস্তিক। আছে বা নাই– কোনোটাতেই নিশ্চিত নন যিনি, তিনি সন্দেহবাদী। ব্যাপার এতই জটিল যে তা মানবীয় বোধজ্ঞানের বাইরে– কেউ এমন মনে করলে তিনি অজ্ঞেয়তাবাদী। কেউ যদি ইস্যুটাকেই অপ্রসাংগিক মনে করেন, তাহলে তিনি মুক্তমনা (free thinker) বা নির্বিকারবাদী।

বিপক্ষ যুক্তিকে ‘কু-যুক্তি’ হিসাবে আপনি যত গালিই দিন না কেন, এই পক্ষগুলোর প্রত্যেকটির পক্ষেই যুক্তি আছে।

প্রচলিত ধারণা হলো, যাচাই করার ব্যাপারটা হলো যুক্তি থাকা না থাকার সাথে সম্পর্কিত। এটি ভুল।

সঠিক কথা হলো, যুক্তি দুর্বল বা শক্তিশালী কিংবা ‘গ্রহণযোগ্য’ মনে হওয়া।

দর্শনের কাছে তাই সব যুক্তি-পক্ষই সমান। প্রত্যেক মত-পথই স্বতন্ত্র দার্শনিক অবস্থান।

ব্যক্তি মানুষ হিসাবে আমরা স্বীয় জীবনবোধের (paradigm অর্থে) আলোকে inference to the best explanation (IBE)-এর ভিত্তিতে যার যার মতো করে ‘সত্য’কে খুঁজে পাই। নিজের বিশ্বদৃষ্টির আলোকে মতাদর্শ বিশেষকে আমরা সঠিক হিসাবে গ্রহণ করি।

মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক সত্যই ‘গৃহীত সত্য’। সেটি ভুল কিবা সঠিক, তা ভিন্ন বিবেচনা। এবং বিবেচনারও কোনো একক মানদণ্ড নাই।

তারমানে, সার্বজনীন কোনো সত্যতা বা মানদণ্ড নাই, এমন নয়।

সার্বজনীনকে ব্যক্তিবিশেষ গ্রহণ করার মাধ্যমে তা (ব্যক্তির কাছে) সার্বজনীন হয়ে উঠে।

ব্যক্তি মানুষ হিসাবে ইউনিভার্সাল বা সার্টেইন ট্রুথকে গ্রহণ করার মাধ্যমে আমরা ইউনিভার্সেলিটি বা সার্টেইনিটির সাথে যুক্ত হই। হেগেল একে objective idealism বা বস্তুগত ভাববাদ হিসাবে বলেছেন।

এর বিপরীতে পোস্ট-মডার্নিজমের কথা হলো, আসলে বিশ্বজনীন বা চিরন্তন সত্য বলে কিছু নাই। সব কিছুই আপেক্ষিক। ইসলামের দৃষ্টিতে, বুঝতেই পারছেন, দার্শনিক উত্তরাধুনিকতা অগ্রহণযোগ্য। ভুল।

এটুকু কেউ বুঝতে না পারলে তার পক্ষে ফিলোসফি নিয়ে অধিকতর এনগেজ হওয়াটা নিছক রিসোর্সের অপচয়।
এবং ক্ষতিকরও বটে।

দর্শনে কোনো ‘প্রমাণ’-এর কারবার নাই। এভিডেন্সকে এখানে আর্গুমেন্ট হিসাবে হাজির করা হয়।

যার যার মতো করে ‘যুক্তিসংগত’ মতকে ব্যক্তি হিসাবে আমরা ‘প্রমাণ’ বিবেচনা করে বিশ্বাস বা গ্রহণ করি।

এর বাইরে অর্থাৎ এই কথাগুলোর বিপক্ষে ফিলোসফি সম্পর্কে কেউ কিছু জানলে, দয়া করে, বলুন…। আশা করি, যা কিছু বলবেন, বুঝে-শুনে বলবেন।

২.

ইসলামিক স্কলাররা ফিলোসফির বিরোধিতা করেছেন, ব্যাপক সংখ্যায়। এটি তখনকার সময়ের ব্যাপার। এখন যা চলছে তা কনটিনিউটি মাত্র।

সুতরাং, ইসলাম বনাম ফালসাফার মধ্যযুগীয় বিরোধটা ঐতিহাসিক, contextualized।

দর্শনের বিরোধিতা করে যা বলা হয়েছে বা করা হয়েছে তাও আদতে দর্শনই বটে।

তৎকালীন দার্শনিকদের বিরুদ্ধে লেখা আবু হামিদ আল গাযালির “তাহাফাতুল ফালাসিফা” বলুন আর হাল নাগাদের স্টিফেন হকিংয়ের “দ্যা গ্রান্ড ডিজাইন”এর কথাই বলুন, চরম আস্তিক আর চরম নাস্তিক উভয় পক্ষসহ সব পক্ষের জন্য দর্শনের এই অপরিহার্যতা ও অনিবার্যতা অলংঘনীয়।

দর্শনকে খণ্ডন করার জন্য দর্শনই লাগবে। দর্শনে আপনি সবই পাবেন। দর্শনের মেশিনের ভেতর দিয়ে আপনি যা ইচ্ছা তাই বানাতে পারবেন। শর্ত হলো, যাই করেন না কেন, যুক্তি লাগবে। মুখস্ত কথায় কাজ হবে না।

এখানে অন্ধ বিশ্বাসের জায়গা নাই। যদিও, জ্ঞানতত্ত্বের দৃষ্টিতে, সব জ্ঞানই সত্যতা ও যাচাইযোগ্যতার সমর্থনপ্রাপ্ত নির্দিষ্ট ধরনের বিশ্বাস। হতে পারে সেটি empirical belief, rational belief অথবা intuitive belief।

নাস্তিকরা, দেখেছি, এই ধরনের কথাবার্তা শুনে চমকে উঠেন। দর্শনের অন্যতম মৌলিক শাখা হিসাবে জ্ঞানতত্ত্বে বিশ্বাসের এত ছড়াছড়ি ও খবরদারী দেখে তারা চরম অস্বস্তিতে ভোগেন।

আবার, আস্তিকদেরও কাউকে কাউকে দর্শন না বুঝেই একে ‘খারিজ’ করার জোশে উদ্বাহু হয়ে ছুটতে দেখি। অথচ, দর্শনই হতে পারে, নাস্তিকতা ঠেকানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার!

ভাবছি, পাবলিকলি ফিলোসফির কোর্স করানো শুরু করবো কিনা…

ফেসবুক প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Noman Saifullah: কতিপয় ঈমানদ্বার এসব ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেন। আপনাকে ধন্যবাদ বিষয়টি আবারও তুলে ধরার জন্য। আসলে বর্তমানে কতিপয় মুমিনের অবস্থা এমন যে, সব কিছুর বিরোধীতা বিশেষত দর্শন চর্চার বিরোধীতা করার নাম ইসলাম বলে মনে করেন। ভারী আজব ব্যাপার!!!

Mohammad Mozammel Hoque: হ্যাঁ, তাই তো।

তদুপরি, কিছু কিছু ধর্মনিষ্ঠ অতি সরল ব্যক্তি আসলেই ‘প্রতিক্রিয়াশীল’। তাদের বিরোধী পক্ষ যাই বলে, তারা চেষ্টা করে, সেটাকে অবমূল্যায়ন করার। যেন বিরোধিতাই হক্ব প্রতিষ্ঠার পথ। সত্যের প্রতিষ্ঠা একটা স্বয়ং ইতিবাচক ব্যাপার। তাই, বিরোধিতা নয়, প্রস্তাবনাই হয় ফোকাসড। বিরোধিতাটা সাময়িক, প্রস্তাবনাটা স্থায়ী।

ইসলামপন্থীরা এই ইনক্লুসিভ মেথডলজিকে প্রায়শই ভুলে যান। ব্যাপারটা দুঃখজনক। আমাদের উচিত, ইতিবাচক মন-মানসিকতা নিয়ে জগত ও জীবনকে দেখা। মাথার মধ্যে খালি ফ্যান্টাসি ঘুরলে এ রকম উল্টাপাল্টা চিন্তায় হাবুডুবু খেতে হবে।

নাস্তিকরা ফিলোসফির দোহাই দেয়। তাই, ফিলোসফি খারাপ। তো, নাস্তিকরা তো মানবতাবাদের কথাও বলে। বস্তুত, মানবতাবাদ হলো নাস্তিকতার ইতিবাচক প্রস্তাবনা। ধর্ম, ঈশ্বর ও ধর্মগ্রন্থের বিকল্প হিসাবে। তাহলে, ধার্মিকরা কি মানবতাবাদের বিরোধিতা করবেন? কী আশ্চর্য…!

Abu Prantor: মধ্যযুগের মুসলিম দার্শনিকরা দর্শন চর্চা করেই দর্শনের বিরোধিতা করেছিলেন। দর্শন চর্চা করেই তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন। এজন্যই তাদের কথা গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিল। কিন্তু আমরা দর্শন পাঠ শুরু করার আগেই এই ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে যাই!

দর্শন একটি জ্ঞানের সাবজেক্টিভ ব্রাঞ্চ। সুতারাং ব্যক্তি তার দর্শন চর্চাকে যেদিকে ইচ্ছা চালিত করতে পারে। ইসলামের সঠিক বোঝাপড়া থাকলে দর্শনচর্চা কোন মুসলিমকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না বলেই আমার বিশ্বাস।

আমরা প্রাত্যহিক জীবনে যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি সেখানেও দর্শনের ব্যবহার করি। হয়তো আমরা জানি না। দর্শনের কাজ হল যুক্তির মাধ্যমে সত্যকে তালাশ করা। সেটা আমরা প্রাত্যহিক জীবনেও করে থাকি। আমি বুঝিনা দর্শনকে বাদ দিয়ে কিভাবে জ্ঞানচর্চা সম্ভব। কারণ প্রত্যেক জ্ঞানেরর সাথেই দর্শন জড়িয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি দেয়া হয়। পিএইচডির মিনিং হল ডক্টর অব ফিলোসফি। মানে কোন একটা জিনিসকে দার্শনিক পদ্ধতিতে প্রস্তাব করা। সেই ভদ্রলোক যেই “ব্লাক এ্যান্ড হোয়াইট” মন্তব্য করেছে, সেই সিদ্ধান্ত উপনীত হওয়ার জন্য তার একটা থিসিস করার দরকার ছিল। কারণ মন্তব্যটাই দার্শনিক মন্তব্য। তিনিও হয়তো দর্শন পড়েই এমন মন্তব্য করেছেন। আবার তিনি নিজেকে ডিফেন্ডও করবেন যুক্তি দিয়ে। কিন্তু তিনি শুধুমাত্র একটা মন্তব্য করেই অন্যদের জন্য দর্শন চর্চার পথ বন্ধ করে দিতে চাচ্ছেন। এটাই প্রবলেমাটিক। তা না হলে সমস্যা ছিল না। তার মানে তিনি দর্শনই বুঝেন না। আর এইসব গোঁড়ামীর কারণেই আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি।

শেষকথা, দর্শনকে মোকাবেলা করতে হবে দর্শন দিয়েই। বিশ্বাস বা অন্ধবিশ্বাস দিয়ে বিপরীত দার্শনিক প্রস্তাবনাগুলোকে মোকাবেলা করা যাবে না।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

আপনার মন্তব্য লিখুন

* চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক। আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।