প্রাণ, বেঁচে থাকা, জীবন – এসবকে নিয়ে আমি ভাবি। অবাক হই। নিজের দিকে তাকাই। আমার বাচ্চাদের দিকে তাকাই। জন্ম আর মৃত্যু নিয়ে ভাবি। ভীষণ অবাক হই ! আমিতো আমার সন্তানদেরকে বানাই নাই। ওদের মা-ও নিশ্চয় ফিল করে, সে তাদেরকে বানায় নাই। ‘প্রকৃতি’ নামের একটা অ-প্রাণ জিনিস কীভাবে এই সজীব প্রাণ তৈরী করে? ‘প্রকৃতি’ আসলে কী?

প্রাণ আর চেতনা থেকে জ্ঞানের শুরু। আবার প্রাণ ও চেতনাই জ্ঞানালোচনার প্রাণকেন্দ্র। নিরীশ্বরের পৃথিবীতে প্রাণের ব্যাখ্যা কী? সামগ্রিকভাবে প্রাণহীন জগত বা বস্তু কীভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ক্যাটেগরির একটা কিছু যেমন ‘প্রাণ ও চেতনা’ সৃষ্টি করলো? প্রাণ ও চেতনা যদি ‘বস্তু’ই হয়, এটি কেমন বস্তু? ‘বস্তু’ বলতে সাদামাটাভাবে যা আমরা বুঝি, এটিতো তার মতো নয়..! ‘প্রাণ ও চেতনা’ যদি বস্তুবিশেষই হয়, এটি কেমন বস্তু, যা আদতে বস্তু হওয়া সত্বেও আমরা নিজেরা বস্তু হওয়া সত্বেও একে, এবং নিজেদেরকে ভুল করে অ-বস্তু মনে করি? বস্তুর পক্ষে কি নিজেকে অবস্তু ভাবা সম্ভব? অ-বস্তু যদি না-ই থাকে তাহলে আমরা অ-বস্তু বা মনের অস্তিত্বে বিশ্বাস করি কেন? মন বা অ-বস্তু যদি না-ই থাকে, তাহলে মানুষ ভুল করে কোনো কিছুকে সঠিক মনে করে কেন? ভুলতো বস্তুনিষ্ঠ নয়, বরং একটা মেন্টাল কনস্ট্রাক্ট। তাই না?

মন বা চেতনা বলে ফান্ডামেন্টালি যদি কিছু নাই থাকে তাহলে এসব ডিলিউশান, তথাকথিত মিয়ার মেন্টাল কনস্ট্রাক্ট ও ডগমার ভিত্তি বা উৎসমূল কী? প্রাণই পৃথিবীর অপার বিষ্ময়। কোত্থেকে আসে? কোথায় যায়? আসলে কি কিছু নাই? যদি আসলে কিছু না-ই থাকে, তাহলে এই জীবনের অর্থ কী? সামগ্রিকভাবে যদি জগতের কোনো উদ্দেশ্য না থাকে তাহলে আমার আপনার এই জীবন ও পৃথিবী নামের এই গ্রহে আমাদের ক্ষণিক-জীবনের সার্থকতা কী? সত্যি কথা হলো, জাহাজ পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে ভালবাসা আর ছিনতাইয়ের মতো, আপনি যদি জীবনের ধারাবাহিকতায় অবিশ্বাসী হোন, আপনার জীবন ও জীবনের সবকিছু আদতে অর্থহীন। আপনার পার্টিকুলার অনেক কিছুর খণ্ডিত অর্থ বা সার্থকতা থাকলেও সামগ্রিকভাব আপনার পুরো জীবনটা নিতান্ত অর্থহীন। আমি আশাবাদী। আশাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। প্রত্যাশাই মানুষের শ্রেষ্ঠ নিয়ামক। আশাহীন ব্যক্তির জীবনধারণ অসম্ভব। পেজিমিস্টিক মানুষ যে কোনো সময়ে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। তার নিজের জন্য এবং অন্যদের জন্য।

জ্ঞানের দিক থেকে জগতের সামগ্রিক অর্থ থাকা না থাকা আমার কাছে সমভাবে যৌক্তিক। কিন্তু প্রাণ, জগত ও জীবনের আলটিমেট অর্থহীনতা আমার আবেগ ও মননের কাছে শিশুতোষ বিষয়ের চেয়েও অযৌক্তিক। একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আমার দৃষ্টিতে, জীবন হলো ওয়ান ওয়ে টিকেট, শুধুই এগিয়ে চলা। হতে পারে, তা চূড়ান্ত ধ্বংসে দিকে, অথবা পরম পূর্ণতার দিকে। আদতে কোনো উদ্দেশ্য নাই, অর্থহীন, এ রকম কোনো জীবনের ‘ধ্বংস’ – নামক কোনো পরিণতি থাকাও লজিকেলি অসম্ভব। কারণ, ‘ধ্বংস’ শব্দটিও একটি অর্থবহতার স্মারক। রিয়েল ওয়ার্ল্ডে ‘সৃষ্টি’, ‘সৃজনশীলতা’, ‘অর্থ’, ‘অর্থহীনতা’, বা ‘ধ্বংস’ – এ ধরনের কোনো মূল্যসূচক (normative অর্থে) ব্যাপার নাই।

আমরা জানি, বস্তু অর্থকে ধারণ করে, বস্তুগত সংকেত ও চিহ্ন অর্থকে প্রকাশ করে। তাই বলে “বস্তু = অর্থ” – এমনটা সঠিক নয়। বাইরের জগতকে বিবেচনায় নিয়ে ব্যক্তি, সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে বিশেষ কোনো অর্থকে নিজের মতো করে তৈরী করে, আরোপ করে, ধরে নিয়ে ব্যবহার করে। অর্থ, উদ্দেশ্য ইত্যাদি ধরনের ব্যাপারগুলো হলো ব্যক্তিগত বা সত্ত্বাগত ব্যাপার, চেতনার ব্যাপার, উপলদ্ধির ব্যাপার। ‘বস্তু’তো উপলব্ধি করে না। ব্যক্তিই করে। সঠিকভাবে করুক আর ভুলভাবে করুক। এমনকি ব্যক্তির ভুল উপলব্ধিও ব্যক্তির বস্তু-অতিরিক্ত স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্ত্বার পরিচয় বহন করে। কারণ, বস্তুতো ভুল করে না করতে পারে না। মানুষই ভুল করে। যন্ত্র আর প্রাণের পার্থক্য হলো আবেগ। যেমন, মানুষের আবেগ আছে। তাই মানুষের জ্ঞানও আছে। যন্ত্রের আবেগ নাই। জ্ঞানও নাই। এমনকি একটি নিরীশ্বরবাদী যান্ত্রিক পৃথিবীতে ‘যন্ত্র’ও নাই। থাকতে পারে না। কারণ, মানবিক মর্যাদার তুলনায় অবনমিত বা ইনফেরিয়র অর্থে, ‘যন্ত্রে’র ধারনাও একটি মনুষ্য-সৃষ্ট বা আরোপিত একটা ব্যাপার।

জীবনের মতো অমূল্য দানে ধন্য হয়েও কিছু মানুষ জীবনের কোনো আলটিমেট উদ্দেশ্য খুঁজে পায় না, অবাক লাগে। বস্তুগত অভিজ্ঞতায় তারা অ-বস্তুকে পায় না। তাই তারা বস্তুবাদী। অ-বস্তুকে কীভাবে বস্তুগত মাপে পাওয়া যাবে, তা আমার বুঝে আসে না। বস্তু, অ-বস্তুকে ইন্ডিকেট করে। যেমন, আইডেন্টিটি কার্ড ব্যক্তিকে কনফার্ম করে। বিশ্বাসটা খুঁজে নিতে হয়। বিশ্বাসকে চাপানো যায় না। ব্যক্তি তার প্রবণতা অনুসারে জগত থেকে ‘প্রমাণ’ খুঁজে পায়। তাই কে কীভবে কী বিশ্বাস করে, করবে, তা তার একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। জ্ঞান থেকে বিশ্বাসের পক্ষে সমর্থন পাওয়া যায় গেলেও গভীর আবেগ আর বোধই হচ্ছে জীবনের বৃহত্তর অর্থ খুঁজে পাওয়ার বা নিরূপন করার উপায়।

আমি অবাক হই, ১৯৬৫ সালেও জগত ছিলো। আমি ছিলাম না। ২০৬৫ সালেও জগত থাকবে, খুব সম্ভবত:। এটি নিশ্চিত যে, তখন আমি থাকবো। কোত্থেকে এলাম, কীভাবে এলাম, কোথায় যাবো? – এসব ভাবনা তাড়িত করে আমাকে। এসব কথা ফিলোসফির মাস্টার মোজাম্মেল সাহেবের দার্শনিক চিন্তাভাবনা নয়। এসব হলো জীবনবোধের ব্যাপার। অামি, আপনি বা কেউ এর থেকে মুক্ত নয়। অবশ্য কেউ যদি চোখ বন্ধ করে, কানে আংগুল দিয়ে ব্যস্ত রাস্তা পাড়ি দেয়া শুরু করে, তার কাছে গাড়ীর হর্ণ আর ট্রাফিকের রেড সিগন্যাল, গ্রিণ সিগন্যাল, সব অর্থহীন। তিনি ভাগ্যবাদী। এসব আলোচনা তার কাছে অসংলগ্ন-অর্থহীন। যখন দেখি ‘স্মার্ট’ (?) নিরীশ্বরবাদীরা ‘গড অভ দ্য গেপস’ কে ‘চান্স অভ দ্য গেপ’ দিয়ে রিপ্লেস করে ধন্যবোধ করেন তখন খুব কৌতুক বোধ করি। সবাই দেখি কোনো না কোনো ‘থিওরি অভ এভরি থিং (TE)’ – এ বিশ্বাস করেন। কারো কাছে God=TE, কারো কাছে Nature=TE। আমার কাছে God=nature=TE   আমি ঈশ্বর ও প্রকৃতিকে বাস্তবে সমার্থক হিসাবে দেখি। ব্যক্তিমানুষের নিরিখে ঈশ্বরই প্রকৃতি, বা প্রকৃতিই ঈশ্বর। প্রকৃতি ও ঈশ্বরের সম্পর্ক pantheistic অর্থে হবে, না কি panantheistic অর্থে হবে, না কি (ইসলাম ধর্ম মোতাবেক) unicity (এককত্ব) অর্থে হবে, সেটি ভিন্ন আলোচনা। ফিলোসফিক্যাল গডের সম্ভাব্যতা যারা মানবেন, অন্ততপক্ষে এ ধরনের একটা ব্যাপারকে যারা আলোচ্যবিষয় হিসাবে গ্রহণ করতে রাজী থাকবেন, কেবলমাত্র তাদের সাথেই পারসোনাল গডের সম্ভাব্যতা নিয়ে কথা হতে পারে। রিলিজিয়নসমূহে বর্ণিত ঈশ্বর হলো ‘পারসোনাল গড’। ব্যক্তি-ঈশ্বরের আলোচনা হলো নবুয়তের যৌক্তিকতার আলোচনা। সেটি অন্য একদিন হবে।

যে ঈশ্বরকে আমরা আরাধনা করি, এবাদত করি, কিংবা অসম্ভব হিসাবে অবিশ্বাস করি, তা ব্যক্তি-ঈশ্বর বা ধর্মীয় অর্থে ঈশ্বর। এভসলিউট, বা উপরে যেমনটা বললাম, থিওরি অভ এভরি থিং (TE)  অর্থে যে ফিলোসফিক্যাল গড, তার অস্তিত্ব স্বীকার করা বা না করার আলোচনা একটা বাহুল্য-আলোচনা মাত্র। এ ধরনের একটা এনটিটিকে ধরে নিয়েই সব আলোচনা শুরু হয়। একটা পরম সত্ত্বার ধারণার ওপরে ভর করি সব জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনা অগ্রসর হয়, গড়ে ওঠে। নিরীশ্বরবাদীর কাছে তা নিষ্প্রাণ ‘প্রকৃতি’। আর ঈশ্বরবাদীর কাছে তা প্রকৃতির নিয়ন্ত্রক ও স্রষ্টা হিসাবে সপ্রাণ ঈশ্বর। মজার ব্যাপার হলো, প্রমাণের বোঝা যখন ঈশ্বর বিশ্বাসীর কাঁধে তখন নিরীশ্বরাদীরা বেশ খোশ মেজাজে থাকে। আপাত: পরাজয়কে মেনে নিয়ে বেকুব ঈমানদারেরা যদি নিরীশ্বর-প্রকৃতিবাদীদের উপর প্রমাণের বোঝাটা চাপিয়ে দিয়ে সব বিগ কোয়েশ্চনের উত্তর দাবী করে বসে থাকতো, তাহলে খেলাটা ভালই জমতো। দিনশেষে আমরা কোনো না কোনো (মত)বাদে বিশ্বাসী হতে বাধ্য। হোক সেটা ঈশ্বরবাদ কিংবা নিরীশ্বরবাদ কিংবা সংশয়বাদ কিংবা নির্বিকারবাদ।