আইন ও নৈতিকতার বিপরীত অনুপাত সম্পর্ক

জীবনবোধের ভিত্তিতে নৈতিকতা গড়ে উঠে। এর মানে, নৈতিকতা হলো জীবনবোধের অপর নাম। জীবনবোধের যে পার্থক্য আমরা দেখতে পাই তা অনেকটাই প্রায়োগিক ও উপরিকাঠামোগত।

মানুষের জীবনবোধের মৌলিক দিকগুলো অভিন্ন প্রকৃতির। সেগুলো বিকাশের মাত্রাভেদই মানুষে মানুষে বিভাজন বা মতদ্বৈততার সৃষ্টি করে। আইন হচ্ছে নৈতিকতাবোধ বা সংক্ষেপে নৈতিকতার প্রায়োগিক দিক।

জীবনবোধের বিকাশ তথা নীতিবোধ সবার সমান হয় না বলেই আইনের সৃষ্টি ও প্রয়োগের প্রসংগ। নৈতিকতা ও আইন – এতদুভয়ের বৈধতার উৎস হলো সত্যতা ও ভালোত্ব।

অতএব, যা ‘ভালো’ তা-ই নীতি ও আইনসম্মত হয়ে থাকে বা হওয়া উচিত।

ভালো বলতে কী বুঝায়?

ভালো (good) কী? মজার ব্যাপার হলো, ‘ভালো’র কোনো ভালো definition আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নাই। তার মানে, ভালো তার নিজ গুণে তথা অন্তর্গতভাবেই (intrinsically) ভালো।

ভালো নিয়ে এ রকম ‘গোলমেলে’ অবস্থার কারণে আইন বানাতে হয়। অর্থাৎ সত্য ও ভালো বলতে আমরা যা বুঝেছি তার প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যা করণীয় তাকে একটা বৃহত্তর কিন্তু সুনির্দিষ্ট আওতার মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য করে চিহ্নিত করতে হয়।

এই দৃষ্টিতে, আইন হলো চাপিয়ে দেয়ার তথা বাধ্যবাধকতার বিষয়। অন্যদিকে নৈতিকতা হলো গড়ে ওঠার বা স্বত:স্ফূর্ততার বিষয়। অথরিটি ছাড়া আইন অচল। এর বিপরীতে নৈতিকতার ক্ষেত্রে অথরিটি হলো বিচার-বিযুক্ত অবস্থা বা ‘dogmatism’ এর পরিচায়ক।

একটি আইনের যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক ভিত্তি তা সংশ্লিষ্ট সব মানুষের মধ্যে সমানভাবে থাকে না। কারণ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি ও জীবনবোধের গভীরতা সমান হয় না।

পরিমাণ নির্ধারণ করে গূণের পরিমাপ (Precision through quantification)

ভাষা দর্শনে precision through quantification বলে একটা কথা আছে। মনে করুন, ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় আপনার স্বাচ্ছন্দ্যবোধ হয়। তাই আপনি Air Conditioner এ ২০ ডিগ্রি ফিক্স করে দিলেন। রুমের তাপমাত্রা এর বেশি হলে AC ‘মনে করবে’ এখন গরম। তখন সে ঠাণ্ডা বাতাস চালু করে দিবে। আবার রুমের তাপমাত্রা যখন ২০-এর কম হবে তখন এসি গরম বাতাস নিঃসরণ করবে।

AC’র কি গরম-ঠাণ্ডার অনুভূতি আছে? না নেই। তৎসত্বেও সে উষ্ণতা ও শীতলতাকে নির্ধারিত (given) কোয়ান্টিফিকেশনের মাধ্যমে প্রেসাইসলি ডিটারমাইন করে।

ব্যক্তির intrinsic feeling, দার্শনিক পরিভাষায় যাকে ‘qualia’ বলা হয়, তা না থাকা সত্বেও air condition system কোনো কক্ষের ‘শীতলতা ও উষ্ণতা’ নিয়ন্ত্রণ করে।

প্রাথমিকভাবে নৈতিকতার ভিত্তিতে তৈরী করা আইনই তেমনিভাবে মানুষের বাস্তবজীবনকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে।

নৈতিক প্রেরণা ও নৈতিকতার মর্যাদা

নৈতিকতার মর্যাদা আইনের চেয়ে বেশি। যদিও প্রায়োগিক দিক থেকে আইনই একমাত্র বিবেচ্য।

আইনের আওতার মধ্যে প্রদত্ত অবকাশ (flexibility) ও বিকল্প-বিশেষকে গ্রহণ করাটা আইনকে অতিক্রম করে যাওয়া বুঝায় না। সংশ্লিষ্ট আইনের পেছনে যে নীতিবোধ থাকে তার প্রশস্ততার (partial indeterminism) কারণেই এহেন অবকাশ বা সুযোগ দেয়া হয়।

নীতিবোধের কাজ হচ্ছে ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধ করা। এতটুকুই।

আইন দ্বারা উদ্বুদ্ধ হওয়ার কিছু নাই। আইন মানতে হবে।

আইন মানার মাধ্যমে নীতিবোধের লংঘন অথবা নৈতিকতার দাবী পূরণ করতে গিয়ে আইনের লংঘন – এমনটি হয়, হতে পারে। আমরা দেখি।

সাধারণ অবস্থায় আইন ও নৈতিকতার সম্পর্ক পরিপূরকই হওয়ার কথা।

নৈতিক আচরণের অপর নাম আইন

আইন ও নৈতিকতার ইতিবাচক সম্পর্কের বিষয়ে ওপরে বলা হয়েছে। একজন নৈতিকতাসমৃদ্ধ ব্যক্তি স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই অর্থাৎ তাঁর নীতিবোধের কারণেই আইনানুযায়ী চলবে। এমনকি আইনটি লেখা না থাকলেও। বলবৎকারী কর্তৃপক্ষ না থাকলেও। সে ক্ষেত্রে তা হলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নীতিবোধ নিঃসৃত আচরণ (code of conduct)।

তাই কোনো আইনের পেছনে যে বিবেচনাবোধ বা সংশ্লিষ্ট আইনের ভিত্তি হিসাবে যে নৈতিক-প্রেরণা তা উক্ত জনপদের লোকজন যত বেশী ধারণ করবে সে আইন তত নির্বিঘ্নে পালিত হবে। এসব হলো আইন ও নৈতিকতার ইতিবাচক সম্পর্কের দিক।

আইন ও নৈতিকতার একটি নেতিবাচক সম্পর্কের দিকও আছে। যা বলার জন্যই এই লেখা।

আইন ও নৈতিকতা পরষ্পরের বিপরীত সম্পর্কেও ক্রিয়াশীল থাকতে পারে।

অপর এক দৃষ্টিতে, আইন ও নৈতিকতার একটি নাজুক ও নেতিবাচক সম্পর্ক বিদ্যমান। তা হলো এটি এক ধরনের বিপরীত অনুপাত সম্পর্ক। বিপরীত অনুপাত সম্পর্ক হলো এমন, এর একটি যে পরিমাণে বাড়বে অপরটি সে পরিমাণে কমবে। নৈতিকতার দাবী পূরণ করতে গিয়ে আইনের বরখেলাফ কিংবা আইন রক্ষা করতে গিয়ে নৈতিকতা লংঘন হতে পারে বলে ওপরে বলা হয়েছে। সে বিষয়ে আমি কথা বাড়াচ্ছি না।

আইন ও নৈতিকতার বিপরীত অনুপাত সম্পর্কের প্রমাণ হলো, দেখবেন, কোনো বিষয়ে আইনে প্রদত্ত সর্বোচ্চ অবকাশকে গ্রহন করা হলো নৈতিকতার দাবী হিসাবে যা করণীয় তার (মানগত দিক থেকে) সর্বনিম্নকে গ্রহণ করার নামান্তর। যদি তাই হয়, তাহলে কখনো কখনো, আইনগত দিক থেকে সর্বোচ্চ সীমায় থাকাটা নৈতিকতা বিবেচনায় সর্ব নিম্নে অবস্থান করাকেই নির্দেশ করে।

যিনি নৈতিক দিক থেকে যত বেশি দুর্বল তিনি আইনের নানাবিধ অসংগতি ও ফাঁক-ফোকরকে তত বেশি খুঁজে বেড়ান, আঁকড়ে ধরেন। আইনের দোহাই দিয়ে তিনি নীতিবোধের ঘাটতিকে ঢাকার চেষ্টা করেন।

তাই norms & principles যাদের মধ্যে প্রবল তাদের জন্য খুব বেশি rules & regulations-এর দরকার পড়ে না। আইন তথা rules & regulations হলো মূলত: norms & principles এর দাবী বা ফল(শ্রুতি) – এ কথাটা যতখানি সত্যি, norms & principles এর ঘাটতি বা অনুপস্থিতিই rules & regulations এর উদ্ভব বা উপস্থিতির কারণ – এ কথাটাও ততখানি সত্যি। কী ‘গোলমেলে’ ব্যাপার, তাই না?

সত্যতা ও প্রমাণের দ্বন্দ্ব

আইন চলে প্রমাণ দিয়ে, উদ্ধৃতি দিয়ে, যাকে আমরা evidence বলি। আইনের ভিত্তি যে যুক্তি (argument) সেখানে প্রমাণ অচল। আইনের ভিত্তিগত যুক্তি তথা নৈতিকতার ক্ষেত্রে সত্যতা বা ভালোত্বই হচ্ছে একমাত্র যুক্তি। তাই আইনের যুক্তি আর নৈতিকতার যুক্তি এক নয়।

কোনো মার্ডার কেসকে এক্ষেত্রে আমরা উদাহরণ হিসাবে নিতে পারি। মনে করুন, কেউ ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন। তার পাশে রক্তমাখা ছুরি হাতে কাউকে পাওয়া গেলো। অতএব, সে-ই খুনী? হতে পারে, সে ব্যক্তি একজন নিরীহ উদ্ধারকারী মাত্র যার সাথে নিহত ব্যক্তির শত্রুতা ছিলো না। অথবা, ছিলো বটে কিন্তু আদতে সে এটা করে নাই। হতে পারে, সত্যিকারের খুনীকে চিহ্নিত করা গেলো না বা চিহ্নিত করা গেলেও তাকে আইনের আওতায় আনা গেলো না। কোনো নিহত ব্যক্তির হত্যাকারীকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও আপনি বলতে পারবেন না যে, সে আদৌ মরে নাই, বা সে আসলে আত্মহত্যা করেছে।

তার মানে হলো, সত্যতা এবং প্রমাণ (evidence অর্থে) সবসময়ে এক (consistent) হয় না। যদিও সচরাচরভাবে evidence মাত্রকেই truth-based মনে করা হয়। evidence হলো আইনের বিষয়। truth হলো নৈতিকতার বিষয়।

নৈতিকতা সর্বদাই ব্যক্তিগত ব্যাপার। ‘সামষ্টিক নৈতিকতা’ বলে কোনো কিছু নাই।

যেখানে আইন আছে কিন্তু বলবৎকারী কর্তৃপক্ষ নাই সেখানে ব্যক্তিবর্গের নৈতিকতার মানই ভরসা। সেখানকার লোকদের সামনে আইন অনুমোদিত সর্বোচ্চ সুযোগকে গ্রহণ করে নৈতিকতার সর্বনিম্ন মানে অবস্থান করবেন, নাকি আইনের মৌলিক দাবী বা মূল অপশনকে গ্রহণ করে নৈতিকতার সর্বোচ্চ মানকে বজায় রাখবেন – এরকম একটা প্রশ্ন এসে যায়।

আইন তার গঠনগত দিক থেকে সামষ্টিক চরিত্রের হওয়া সত্বেও নৈতিকতা একটা ব্যক্তিগত বোধের বিষয়। তাই তথাকথিত ‘collective morality’র নামে আমরা সুবিধাপ্রাপ্তির সহজাত নির্দোষ প্রবণতার সাথে ‘সুবিধাবাদিতা’কে গুলিয়ে ফেলছি কিনা, ভাবতে হবে।

আইন ও নৈতিকতার ব্যাপারে ইসলাম কী বলে?

ইসলামী-অনৈসলামী, আস্তিক-নাস্তিক, রাজনৈতিক-সুশীল, নারী-পুরুষ, সেক্যুলার-ফ্যানাটিক নির্বিশেষে আমাদের বিরাট অংশই আইনের সুবিধা নিয়ে অনৈতিক সুবিধাবাদিতা চর্চা করার ব্যাপারে কঠোরভাবে ‘শান্তিচুক্তিবদ্ধ’। ইসলামের দিক থেকেই যদি দেখি, আইন হচ্ছে নিছক দুনিয়াবি বিষয়। আখিরাতে নৈতিক আইনের ভিত্তিতেই সব বিচার-আচার হবে।

ইসলামে সামষ্টিক প্রজ্ঞা বা collective rationality বলে কিছু নাই। দৃশ্যত: বিরাজমান সামষ্টিক বিবেচনাবোধ বা collective rationalityর কোনো বিষয়ে আপনি-আমি ব্যক্তিগত কী করছি, বা করবো, তা-ই মূল বিষয়। দায় বা accountability বলে যে জিনিস আছে, তা, ইসলামের দৃষ্টিতে, সদা-সর্বদাই ব্যক্তিগত।

আলোচনার ভিডিও লিংক:

লেখাটির ফেসবুক লিংক

আপনার মন্তব্য লিখুন

* চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক। আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।