বিজ্ঞান, দর্শন ও ধর্মের দ্বন্দ্ব নিছক বিষয়গুলোকে বুঝার ভুল

(ক) বিজ্ঞান:

১। কোনো কিছু সম্পর্কে আমাদের জানার আগ্রহ শুরু হয় ইন্দ্রিয়-অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা হলো বিজ্ঞানের প্রধান হাতিয়ার। অবশ্য ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতামাত্রই বিজ্ঞান নয়, আমরা জানি। মানুষ প্রকৃতিগত কারণেই বিজ্ঞাননির্ভর অর্থে বৈজ্ঞানিক। একে ঠিক সুডো-সায়েন্স বলা যাবে না। সাধারণ মানুষের বিজ্ঞানপ্রিয়তাকে ফোক-সায়েন্স বলা যেতে পারে।

২। জীবন, জগত ও বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা (paradigm of thought) অভিজ্ঞতা লাভের এই প্রক্রিয়াকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে এবং তা এই ধরনের অভিজ্ঞতা হতে জ্ঞান তৈরীর ক্ষেত্রে সবিশেষ ভূমিকা পালন করে।

৩। ধর্ম ও দর্শনের তুলনায় বিজ্ঞানের কাজের ক্ষেত্র ক্ষুদ্রতর ও সংকীর্ণ কিন্তু তুলনামূলকভাবে সুনির্দিষ্ট। যার ফলে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান হয় অপ্রচলিত ও নিরপেক্ষ ধাঁচের।

(খ) দর্শন:

১। দার্শনিক প্রশ্ন-উত্তরের প্রক্রিয়াগুলো শুরু হয় জীবন, জগৎ ও বাস্তবতার মৌলিক প্রশ্নগুলো সম্পর্কে একটি সামগ্রিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে।

২। অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় কোনো কিছু পেয়ে গেলে তা জ্ঞানের বিষয় হতে অবনমিত হয়ে তথ্য হিসাবে হাজির হয়। বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলোকে দর্শন ব্যবহার করে। পাশাপাশি, দর্শন, বিজ্ঞানের পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতাগুলো ছাড়িয়ে যায়।

৩। দর্শনের প্রস্তাবনাসমূহ স্বভাবতই বৈচিত্র্য ও বৈপরীত্যে ভরপুর। এর কারণ হলো ইন্দ্রিয় পর্যবেক্ষণের তুলনায় যুক্তিপ্রক্রিয়াটাই স্বয়ং জ্ঞানের কর্তা হিসাবে ব্যক্তি মানুষের ব্যাপার।

৪। যুক্তি বা আর্গুমেন্ট অধিবিদ্যার দিক থেকে সাবজেক্টিভ হলেও জ্ঞানতাত্ত্বিক দিক থেকে তা অবেজক্টিভ। Arguments are metaphysically subjective but epistemologically objective.

৫। মানুষ মাত্রই দার্শনিক। কেননা, যুক্তি তার হাতিয়ার। এমনকি, যুক্তির বিরুদ্ধেও সে যখন বলে তখনো সে কোনো না কোনো যুক্তিকেই অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে।

(গ) ধর্ম:

১। ধর্মের ভিত্তি হলো বিশ্বাস। ধর্ম বৃহত্তর পরিসর নিয়ে কাজ করে। ধর্মের আবেদন বিশ্বজনীন বা holistic। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিজ্ঞান সমর্থিত কোনো দার্শনিক প্রস্তাবনাকে সে সঠিক ‘উত্তর’ গ্রহণ করে।

২। নানা ধরনের দৈহিক সীমাবদ্ধতাসম্পন্ন মানুষ প্রজাতির পক্ষে বিশ্বাস করা ছাড়া কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান গ্রহণ করা কী সম্ভব?

৩। সত্যিকার অর্থে, দর্শন ও বিজ্ঞানও এক ধরনের নিজস্ব বিশ্বাসব্যবস্থার উপর দাঁড়িয়ে আছে। principle of uniformity of nature (PUN), the future resembles the past তথা inductive প্রসেস, modus ponens সহ এ ধরনের কিছু দার্শনিক প্রপজিশন ছাড়া বিজ্ঞান অচল।

৪। জ্ঞান নিজেই তো এক ধরনের বিশ্বাস। যদিও তা justified এবং true বিলিফ। এই জাস্টিফিকেশন ও ট্রুথের বিষয়গুলো মেটাফিজিকেলি সাবজেক্টিভ বা ব্যক্তিনিষ্ঠ।

৪। ধর্ম হলো এমন বিশেষ ধরনের জীবনব্যবস্থা যা বিলিফ ও রিচুয়্যাল সিস্টেম আকারে মানুষের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। বিজ্ঞান বা দর্শনকে যারা জীবনব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণ করে তার আদতে বিজ্ঞান ও দর্শনকে ধর্ম হিসাবেই মানে। কাশির ঔষধ ফেনসিডিলকে মাদক হিসাবে গ্রহণ করার মতো।

৫। মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই ধর্মপ্রবণ।

শেষ কথা:

বিজ্ঞান, দর্শন ও ধর্মের সম্পর্ক ক্রমসোপানমূলক। তাই, তার এগুলোর কোনটাকে বাদ দিয়ে কোনটাকে নিব, এ ধরনের প্রশ্ন মাত্রই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট বা আইদার-অর ফ্যালাসি।

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Sarwar Kamal: সবাই কান্টের সূরে এই কথাটি বলছেন যে, আমাদের জ্ঞান শুরু হয় ইন্দ্রীয় অভিজ্ঞতা দিয়ে। ইন্দ্রীয় তৈরি হওয়ার পূর্বেই মানুষের জীবচৈতন্য সৃষ্টি হয়, যার ভিত্তিতে মানুষের জৈবিক ও চেতনাগত বিস্তার ও সম্প্রসারণ ঘটে। একটি ডিম্বাণু বা শুক্রাণুর তো ইন্দ্রীয় নেই, কিন্তু সচেতনভাবেই তা তার পরিপার্শ্বের সাথে সংবেদন বিনিময় করে। ইন্দ্রীয় অভিজ্ঞতা নয়, বরং ইন্দ্রীয় তৈরি হওয়ার পূর্বেই মানুষ জানতে শুরু করে তার জীবচেতনার বা জীবসত্তার ধর্মগুণে। ইন্দ্রীয়লব্ধ জ্ঞান হলো জ্ঞানের একটা বিশেষ পর্যায়, শুরু নয়, শেষও নয়।

Mohammad Mozammel Hoque: Correct. What I have said is the popular understanding of the sources of knowledge. Actually, my very personal opinion is that all the sources are actually the same thing from different point of views. Intuition is the basis of everything. Furthermore, knowledge is given…, no matter who has given it. Thanks for the comment good enough for your level of scholarship.

লেখাটির ফেসবুক লিংক

আপনার মন্তব্য লিখুন

* চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক। আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।