আন্তর্জাতিক দর্শন দিবসের ভাবনা

হ্যাঁ, দুনিয়ার অধিকাংশ নামকরা য়ুনিভার্সিটিতে ফিলোসফি নামক সাবজেক্টটাই নাই। ইনফেক্ট, দুনিয়ার খুব কম সংখ্যক মানুষই ফিলোসফি নামক সাবজেক্ট নিয়ে পড়েছেন। তাই, পাত্তা পাওয়ার দিক থেকে, উন্নয়ন ও জব মার্কেটে ডিমান্ডের দিক থেকে, বলতে পারেন, এটি টোটালি লাপাত্তা এক ‘জিনিস’।

তবে, এ এক আজীব ‘জিনিস’। যাকে খণ্ডন করতে তাকেই লাগে। যাকে বাদ দিতে গেলেও তাকে লাগে। যাকে ফেলে দিয়ে আসলেও, এমনকি কবর দিয়ে আসার পরেও ঘরে এসে দেখতে হয়, আপনাকে স্বাগত জানানোর জন্য সে সেজেগুঁজে হাসিখুশি দিব্যি বসে আছে। কেমন ধরনের এক আশ্চর্য ব্যাপার-স্যাপার!

ফিলোসফি আসলে কী?

এক কথায় বললে, ফিলোসফি হলো যুক্তির খেলা কিংবা ব্যবহার। এর ইনহারেন্ট টেনডেন্সি হলো, মানুষকে ক্রমান্বয়ে জীবনের বৃহত্তর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে ইনভলভ করা।

ফিলোসফি কাউকে স্থির থাকতে দেয় না। সব সময়ে ভাবায়। তবে, ওই যে বললেন, দুনিয়ার অধিকাংশ ‘ভালো-ভালো’ য়ুনিভার্সিটিতে ফিলোসফি পড়ায় না। আপনার কথাটা সঠিক।

আপনার কথার সাথে আমি আরও যোগ করছি, খুব কম সংখ্যক মানুষই এই সাবজেক্ট সম্পর্কে সঠিকভাবে জানে। বাস্তবজগতে এ যেন এক অপাংক্তেয় জিনিস। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমাদের শরীরের নানা উপাদান ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আমাদেরকে প্রতিনিয়ত বাঁচিয়ে রাখে। সেগুলো নিয়ে আমাদের তেমন ভাবনাচিন্তা করা লাগে না। অথচ এগুলোর খানিকটা রস-কষ বাইরে এসে এমনকি আমাদের গায়ে লাগলে আমরা তাড়াতাড়ি সেসব ধুয়ে ফেলি, অস্বস্তি ও অশুচি বোধ করি।

ফিলোসফির প্রতি আমাদের অস্বস্তিবোধও এমন ধরনের ‘অপরিহার্য-অষ্পৃশ্যতা’র মতো। ফিলোসফি আমাদেরকে ভাবতে বাধ্য করে। যদিও এই অন্তর্গত ভাবনা-চিন্তা সম্পর্কে আমরা সাধারণত সচেতন থাকি না। এর কারণ হলো, আমরা নিজেদের স্বগত ভাবনাগুলোকে স্বীকার করে নিতে ভয় পাই। তাই, ‘ফিলোসফি নিয়ে ভাবি না’ বলে নিজের এই অপরিশীলিত ভাবনাগুলোকে লুকিয়ে রাখতে চাই।

আমরা চোখ দিয়ে দেখি। মাঝে মাঝে আয়নাতে দেখা ছাড়া সেই চোখকে আমরা সরাসরি দেখতে পাই না। এমনকি আয়না দিয়েও যখন দেখি তখন চোখের বাহিরের একটা অবয়বকেই দেখি। তেমনিভাবে জ্ঞানের চোখে আমরা বিশ্বকে দেখি, জানি। যদিও আমাদের এই অন্তর্গত চিন্তাধারার অস্তিত্ব ও গুরুত্বকে আমরা প্রায়শই স্মরণে রাখি না।

হ্যাঁ, আপনার কথাই সঠিক, ফিলোসফি কিছু বানায়নি। দেশের জিডিপিতে ফিলোসফির অবদান শূন্য। উল্টো, দার্শনিকদের পালতে গিয়ে দেশের ঘাটতি-বাজেটের খানিকটা বৃদ্ধি ঘটে। তবে, ফিলোসফি একটা কিছু বানিয়েছে। বিশেষ একটা কাজ সে করেছে। শুনবেন? কিংবা অস্বীকার করবেন?

ফিলোসফি মনুষ্য সদৃশ্য দ্বিপদী একটা প্রাণীকে আজকের এই মানবিক মর্যাদায় উন্নীত করেছে। সোজা কথায়, ফিলোসফির কারণে মানুষ মানুষ হতে পেরেছে। ফিলোসফি কিছু বানায় নাই, কিন্তু সবকিছু বানিয়েছে যে মানুষ, সে মানুষ কিন্তু মানুষ হতে পেরেছে ফিলোসফির কল্যাণে।

ফিলোসফির তাড়নায় মানুষ গুহা হতে বের হয়ে এসে সভ্যতা গড়ে তুলেছে। এক অজ্ঞাত কিন্তু প্রবল অনুসন্ধিৎসা তাকে আজকের এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।

হোক প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে, জানতে চাওয়া, সীমাকে অতিক্রম করে যাওয়া, অপর প্রান্তে কী আছে সেটাও জানতে চাওয়ার এক দুর্নিবার আগ্রহের কারণে মানুষ জ্ঞান গবেষণায় নিয়োজিত হয়েছে। আবিষ্কারের নেশায় মেতে উঠেছে। নিজের অসীম সম্ভাবনাকে কীভাবে যেন সে বুঝতে পেরেছিল।

তাই তো সে, প্রকৃতিকে তার মতো করে নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করেছে। যা ছিলো, যা দেয়া আছে তাকে সে সাধ্যমতো ভেংগে নতুন করে গড়েছে। নিজের সামর্থ্যকে সে প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে নিয়েছে। আপন স্বপ্নকে সে প্রতিনিয়ত সাজিয়ে রেখে গেছে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।

কেন জানি প্রথম থেকেই সে কোনো এক অন্তর্গত প্রেরণায় বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার, আরো বড় হওয়ার, সীমাহীন অনিশ্চিত গন্তব্যে এগিয়ে যাওয়ার, নিজের ‘ন্যাচারাল হেবিটেটকে’ ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কেন তার এ তাড়না? কিসের থেকে আসে তার এই অন্তহীন প্রেরণা? এসব সে নিজেই সঠিক জানে না। শুধু জানে, এগিয়ে যেতে হবে। এ যেন দিগন্ত ছোঁয়ার এক কৈশোরিক পাগলামো।

নিছক বিবর্তনতত্ত্ব দিয়ে আপনি এটি ব্যাখ্যা করতে পারবেন না। যদিও এর একটি বিবর্তনবাদী ব্যাখ্যা আছে, কিংবা হতে পারে। বিবর্তনতত্ত্বও তত্ত্ব হিসাবে অপরাপর তত্ত্বগুলোর মতো একটা ফিলোসফিক্যাল থিওরি বটে। প্রাণিবিদ্যার বিবর্তন তত্ত্ব আর ফিলোসফি ডিপার্টমেন্টে পড়ানো বিবর্তন তত্ত্ব এক জিনিস নয়। যেমন করে মেথোডলজিক্যাল অর সায়েন্টিফিক ন্যাচারালিজম এবং ফিলোসফিক্যাল ন্যাচারালিজম এক জিনিস নয়। এগুলো নিয়ে অন্য কোনো একদিন আলোচনা করা যাবে।

আজ শুধু এটুকুই বলবো, নিছক ধারণার বলেই, পাওয়ার অব আইডিয়ার ওপর ভর করেই, নিজের যা কিছু অর্জন, তার সবকিছু নিয়েই ‘মানুষ’ আজকের এই সভ্য মানুষ হিসেবে গড়ে উঠেছে। মানুষের মধ্যে সভ্যতাগত তাবৎ ভিন্নতা সত্ত্বেও মানুষই শুধু সভ্যতা গড়ে তুলেছে। প্রজাতি হিসেবে মানুষই শুধু সভ্য হতে পেরেছে। অন্য কোনো প্রাণী পারে নাই। কেন পারে নাই?

কারণ, তাদের জীবন আছে বটে। বেঁচে থাকার তাড়নাও আছে। কিন্তু নাই কিংবা গড়ে ওঠে নাই তাদের বৃহত্তর জীবনবোধ। ফিলোসফি হলো এই মানবিক জীবনবোধের অপর নাম।

ফিলোসফির পাল্লায় পড়ে, জ্ঞানের অপ্রতিরোধ্য তাড়নায়, যুক্তির শক্ত টানে কিংবা প্রচণ্ড চাপের অনিবার্য পরিণতিতে সে সেরা প্রাণী হিসাবে জলে, স্থলে ও অন্তরীক্ষে যুগপৎভাবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব কায়েম করেছে।

মানুষের এই শুদ্ধ পরিচয় ও এই অন্তর্গত প্রেরণা এসেছে ফিলোসফি থেকে। যে কোনো সাবজেক্টের শুরুর এবং শেষের দিকের মৌলিক ইস্যুগুলো নিয়ে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র পদ্ধতিতে এটি কাজ করে। কারো স্বীকৃতি-অস্বীকৃতির পরোয়া করে না। এ এক অনিরুদ্ধ গতি। এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা।

আর্গুমেন্টই হলো ফিলোসফির একমাত্র সম্বল। যুক্তির এই হাতিয়ারকে ব্যবহার করে সে হতে পারে ঈশ্বরের প্রতিনিধি কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী।

ফেইসবুক থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Faisal Tariq: “হ্যাঁ, দুনিয়ার অধিকাংশ নামকরা য়ুনিভার্সিটিতে ফিলোসফি নামক সাবজেক্ট নাই।”

The reality is quite opposite. Philosophy is taught/researched only in well-established and reputed universities 🙂

Mohammad Mozammel Hoque: A biochemistry teacher with a PhD from Japan has said it to me.

Faisal Tariq: During my PhD, I worked both in the UK and in Japan and aware of the ‘PhD culture’ in both places. So, I probably do understand why he made such comments. But I do not blame him really. We grew up in an environment where any domain except Engineering and Medicine are brushed aside.

I had the same feeling towards arts and social sciences disciplines until I started my PhD. We were exposed to the research aspects of different domains (particularly arts and social science) for the first time and we learned to appreciate the necessity of all disciplines for the advancement of human civilisation.

Borhan Ahmed: খুব কঠিন একটা সাবজেক্ট এই ফিলোসফি।

Mohammad Mozammel Hoque: নারিকেলের মতো।

Sarwar Kamal: আমিও গতকাল ছাত্রদের নারিকেলের উদাহরণ দিয়ে দর্শনের তরল মতবাদ হতে ঘনীভূত হওয়া, কঠিন হওয়া এবং নিরস হওয়ার বিষয়টি বোঝালাম।

Borhan Ahmed: নারকেলের সাথে কী রিলেশন দর্শনের?

Mohammad Mozammel Hoque: নারকেলের বাহিরটা শক্ত হলেও ভিতরটা নরম ও সুস্বাদু। তেমন করে ফিলোসফি আপাতদৃষ্টিতে কঠিন মনে হলেও আসলে তা বেশ সহজ ও আকর্ষণীয়।

Sarwar Kamal: সক্রাতেস পর্যন্ত দর্শন ছিলো তরল আকারের, যার স্থির রূপ ছিলো না। প্লাতো-আরিস্তোতলের পর্যায়ে এসে গ্রীক দর্শনের একটি সুনির্দিষ্ট স্থির রূপ দাঁড়ায়। য়ুরোপীয় দর্শনের মধ্যে এখনো সবচেয়ে উপাদেয় দর্শন হলো প্লাতো-আরিস্তোতলের দর্শন। তারপর আধুনিক কালে কান্ট আর হেগেল হলেন সেই নারকেলের মালা, অতি শক্ত। মার্ক্স থেকে শুরু করে পরের দর্শন হলো নারিকেলের পুরো খোসা, যার পরিমাণ বেশি, নিরস, অতৃপ্তিকর। এখন দর্শনের মূল মজা পেতে গেলে নারিকেল আর পানি খেতে হবে, বিমূর্ত সত্তা বিষয়ক চিন্তার স্তরে পৌঁছতে হবে। আর তা করতে গেলে সমসাময়িক দর্শন পড়ে নারিকেলের খোসা ছাড়াতে হবে, এরপর কান্ট ও হেগেলের দর্শন পড়ে নারকেলদর্শনের শক্ত মালাটা ফাটতে হবে। তারপর দর্শনের স্বাদ পাওয়া যাবে।

Khondoker Zakaria Ahmed: ধন্যবাদ, সুন্দর লেখার জন্য। ফিলোসফি ব্যতীত মানুষ অচল। ফিলোসফিই মানুষকে উন্নয়নের পথ দেখায়। ফিলোসফি মানুষকে মানুষ হতে সাহায্য করে। মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার চিন্তা, গবেষণা, যুক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গির উপর, যা করতে ফিলোসফি সাহায্য করে। এটি কঠিন বিষয় কিনা জানি না। তবে এখন যদি আমাকে নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ দেয়া হতো, তাহলে আমি ফিলোসফি পড়তাম।

Gazi Nazrul Islam: প্রত্যেক মানুষের জীবনে বাস্তব ফিলোসফি বা দর্শন রয়েছে। মানব জীবনের ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা এবং সে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য তার বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা, গবেষণা, যুক্তি ও দৃষ্টিভংগির উপর গড়ে উঠে বাস্তব জীবন দর্শন। যাদের বিশ্বাস ও টার্গেট অনন্ত জীবনের কল্যাণ, তাদের কাছে বাস্তব ফিলোসফি এক ধরণের। আর যাদের বিশ্বাস ও টার্গেট দুনিয়ার জীবনের ভোগ বিলাস, তাদের কাছে স্তব জীবন দর্শন অন্য ধরনের। বাস্তব জীবনকে উপেক্ষা করে তাত্ত্বিক ফিলোসফির মাঝে কোনো কল্যাণ নাই।

Masuk Pathan: এবং ফিলোসফির যুক্তিই তাকে ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে দেয়নি। কারণ, যুক্তি তো ঈশ্বরের আরেক সৃষ্টি সময়কে অতিক্রম করতে পারে না। কাজেই ফিলোসফি জীবনের অমিত সম্ভাবনা জাগরুক দুঃসাহসী হাতিয়ার হয়ে জ্ঞানের রাজ্যে দাপটে চলুক এবং আপন সীমানাটা বুঝে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হোক।

Mohammad Mozammel Hoque: প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও তা ফিলোসফি হবে। নাস্তিকতার মতো আস্তিকতাও ফিলোসফিরই অন্যতম তত্ত্ব। বিশ্বাসী এই তত্ত্বকে সত্য হিসাবে গ্রহণ করে।

Mahmudur Rahman: I don’t know how it sounds as doctor of philosophy in philosophy. But all doctorates, except medicine, exercise philosophy to some extent. But those are mostly based on facts (at least from the perspective of science background).

Mohammad Mozammel Hoque: কোনো ডিসিপ্লিনের শুরুর আগে আর শেষের পরে যেসব জিনিস থাকে, ফিলোসফি সেসব নিয়ে এনগেজ হয়। তখন তাকে ওই সাবজেক্টের দর্শন বলা হবে। philosophy is always philosophy of something. It’s a second-order discipline. That means, it starts by taking the concerned disciplines whatever findings as granted. But proceeds to inquire the potential inconsistencies there. Philosophy not only finds the flaws; it also proposes the alternatives.

Jony Akhand:  স্টুডেন্ড লাইফে আপনাকে আমি বিশেষ পছন্দ করতাম না। আজকে আপনাকে বিশেষ ধন্যবাদ দিচ্ছি। ভুল হলে সরি, স্যার।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    * চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক। আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।