JTB=K’র প্রচলিত ব্যাখ্যা কী?

সনাতনী জ্ঞানতত্ত্ব অনুসারে, মহামতি প্লেটোর বরাতে জ্ঞান হলো যাচাইকৃত বা যাচাইযোগ্য সত্য বিশ্বাস (JTB=K)। এভাবে বেশ চলছিলো গত আড়াই হাজার বছর। এতদিনকার জ্ঞানতত্ত্বে বিতর্কটা ছিলো মূলত: জ্ঞানের উৎস হিসাবে অভিজ্ঞতা কিংবা বুদ্ধির মধ্যে কোনটি আগে, বা কোনটির গুরুত্ব বেশি, তা নিয়ে। আমেরিকান ওয়েন স্টেইট ইউনিভার্সিটির মেধাবী কিন্তু চরম অলস খ্যাতিমান শিক্ষক Edmund L. Gettier নিছক চাকুরী বাঁচানোর জন্য বন্ধু-সুভানুধ্যায়ীদের চাপে পড়ে ১৯৬২-৬৩ সালের দিকে স্রেফ তিন পৃষ্ঠার একটা প্রবন্ধ লিখেন। কোনো মানসম্পন্ন গবেষণা পত্রিকায় সেটি ছাপানোর যোগ্য হয়েছে – এমন আত্মবিশ্বাস না থাকায় তিনি সেটি নিজের কাছে ফেলে রাখেন। উনার সহকর্মীদের কেউ একজন সেটি স্পেনিশ ভাষায় অনুবাদ করে ল্যাটিন আমেরিকার কোনো এক জার্নালে ছাপানোর জন্য পাঠান। পরে সেখান হতে অন্য কেউ সেটি ইংরেজীতে অনুবাদ করে Analysis -এ প্রকাশের জন্য পাঠান। এই-ই হলো যুগপ্রবর্তনকারী “Is Justified True Belief Knowledge” শিরোনামের প্রবন্ধটির জন্ম কাহিনী। Keith Lehrer আর Alvin Plantinga এর মতো বিখ্যাত সহকর্মীদের সাথে কাজ করা এই প্রফেসরের আর কোনো লেখাজোকার কথা আমি জানতে পারিনি!

যাহোক, জ্ঞানের সংজ্ঞা হিসাবে এই tripartite অর্থাৎ ত্রিশর্তমূলক সংজ্ঞার অসুবিধা নিয়ে গেটিয়ার যে আপত্তি তুলেছেন তা নিয়ে পরে কথা বলবো। এখনকার কথা হলো জ্ঞান হওয়ার জন্য কোনো বচনে সত্যতা, বিশ্বাস ও যাচাইকরণের যে শর্তত্রয়ের কথা বলা হয়েছে তা আদতে কতটুকু যুক্তি সংগত? উল্লেখ্য, JTB একাউন্টকে রিফিইউট করার চেয়ে বরং এর অন্তর্গত অসংগতির ওপরই ছিলো গেটিয়ারের মূল ফোকাস। তার আগে কেউ জ্ঞানের ক্ষেত্রে lucky guess এর এই সমস্যাটির কথা বলেন নাই, এমনও নয়। ব্যাপার হলো, গেটিয়ারকেই কেন জানি ‘ইতিহাস কবুল করেছে’…! এক কথায় বলতে গেলে গেটিয়ার সমস্যাই হচ্ছে সমকালীন জ্ঞানতত্ত্বের সারকথা। সমাধান? বহুজনে বহু কিছু দিয়েছেন। দিন শেষে, যেই লাউ সেই কদু …!! পরে কোনো সমসময়ে এটি ঘেটে দেখা যাবে।

দ্বিতীয় বর্ষ ২০১৬ এ সমকালীন জ্ঞানতত্ত্বের ভূমিকা কোর্সটির নবীণ পণ্ডিতদের জন্য পরবর্তী ক্লাসে একটা এসাইনমেন্ট দিয়েছি। জানি না তারা এই পেইজের সাথে ইতোমধ্যে কানেন্টেড কিনা। একটা কথা আছে না, তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেন। যদিও আমি তাদেরকে সত্যি সত্যি ‘অধম’ মনে করছি না। কিনতু আমাদের এখানকার উচ্চশিক্ষার সিস্টেমটা এতই অধ:পতিত যে, কিভাবে কী করি, বুঝতে পারছিনা!!!!!! লেখাপড়ার বিষয়াদি ফেইসবুকে দেয়া সত্বেও স্টুডেন্টরা কেন জানি ততটা সাড়া দেয় না … !!!

তো সেই এসাইনমেন্টটা হলো ছয়টা পরষ্পর সম্পর্কিত প্রশ্নকে নিয়ে। truthকে নিয়ে ২টি, beliefকে নিয়ে ২টা ও justificationকে নিয়ে ২টি। সত্যতাই জ্ঞান, কিংবা (সত্যতা বাদে) যাচাইকৃত বিশ্বাসই জ্ঞান – এমনটা হলে সমস্যা কী? যাহাই বিশ্বাস করা অর্থাৎ (জ্ঞান হিসাবে) গ্রহণ করা হবে তা-ই জ্ঞান হিসাবে বিবেচনা করা হবে – এমনটা মনে করলে সমস্যা কী? কিংবা, (বিশ্বাসকে বাদ দিয়ে) যাচাইকৃত সত্য ই জ্ঞান – এমনটা মনে করলে অসুবিধা কী? একইভাবে, যাচাইকৃত সত্য বিশ্বাস – এই তিনটা বিষয়কে স্বতন্ত্র শর্ত হিসাবে একসাথে না নিয়ে যাহাই যাচাইকৃত তাহাই জ্ঞান – এমনটা মনে করলে সমস্যা কী? অন্যভাবে বললে, যাচাইকরণের শর্তকে বাদ দিয়ে সত্য বিশ্বাস কে জ্ঞান হিসাবে গণ্য করলে কী ভুল হয়?

T=K মনে করলে সমস্যা কী?
JB=K মনে করলে সমস্যা কী?
B=K মনে করলে সমস্যা কী?
JT=K মনে করলে সমস্যা কী?
J=K মনে করলে সমস্যা কী?
TB=K মনে করলে সমস্যা কী?

কী বুঝলেন? না বুঝলে আওয়াজ দিয়েন। সবচেয়ে ভালো হয় কী বুঝেন নাই, সেটি যদি বলেন…।

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য:

Wahed Sujan: আচ্ছালাম, আপনার প্রশ্ন দেইখা থাকতে পারলাম না। হয়তো ছেলেমানুষী উত্তর। কিন্তু মনে হলো পুরনো দিনে ফিরে গেলাম…………….

T=K মনে করলে সমস্যা কী?
JB=K মনে করলে সমস্যা কী?
B=K মনে করলে সমস্যা কী?
JT=K মনে করলে সমস্যা কী?
J=K মনে করলে সমস্যা কী?
TB=K মনে করলে সমস্যা কী?

সত্যতা, বিশ্বাস ও যাচাই নিয়ে ২টি করে প্রশ্ন আছে।

‘=’ চিহ্নের দুই পাশে থাকা দুই বিষয়কে পরিমাণ বা গুণগত সমান মনে হয়। পরিমাণের ব্যাপারে হয়তো অনেকটা নিঃসন্দেহে থাকি। কিন্তু গুণগত ক্ষেত্রে? এটা অবশ্য আলোচ্য নয় এখানে। কিন্তু এটা সত্য ‘=’ চিহ্নের দুইপাশে যা যা আছে তা সমান কি-না? যেহেতু আমরা JTB=K ধরে নিয়েছি (গেটিয়ার সমস্যা সত্ত্বেও), তাহলে নিশ্চয় সমান নয়। তাহলে—

T=K: সবক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো, জ্ঞান হিসেবে দাবি করার সমস্যা। অর্থাৎ, ভিত্তিটা কী? সত্য অবশ্যই জ্ঞান হওয়ার শর্ত। কিন্তু একে জ্ঞান দাবি করলে প্রধান সমস্যা হলো কোন উপায়ে তা দাবি করছি? এই ধরনের রক্ষাকবচ না থাকলে কাকতাল ব্যাপারও সত্য আকারে হাজির হতে পারে। কিন্তু বিশ্বাস খানিকটা গোলমেলে। সাধারণত সত্য দাবি করলে অন্তর্নিহিতভাবে বিশ্বাস করা হয়। এটা বলা কি সম্ভব? ‘বিষয়টি সত্য কিন্তু আমি সত্য বলে বিশ্বাস করি না’।

JB=K: যাচাইকৃত বিশ্বাস হলেই কি জ্ঞান হবে? তাহলে কাকে জ্ঞান দাবি করা হচ্ছে? বিশ্বাসকে। কিসের বিশ্বাস? কোনো একটি ঘটনা বা বচন যাকে কিছু একটা কিছু (সত্য) হওয়ার কারণে বিশ্বাসযোগ্য প্রতীয়মান হয়। মানে খোদ বিষয়টাই উপস্থিত নাই। তাহলে যতটা যাচাইকরণের সঙ্গে, তার চেয়ে বেশি সত্য বা মিথ্যা দাবির করার সঙ্গে বিশ্বাস জড়িত।

B=K: আচ্ছা বিশ্বাস যদি জ্ঞান হয়? তাহলে প্রশ্ন আসবে কিসের বিশ্বাস, কেন বিশ্বাস? কারণ, বিশ্বাস হলো কোনো কিছুর উপর বিশ্বাস। উপরে আমরা বলেছিলাম কোনো কিছু বিশ্বাস করি, অথচ তার উপর ‘সত্য’গুণ আরোপ করা হয় নাই— তা একধরনের ফ্যালাসি তৈরি করে। এ ছাড়া বিশ্বাসকে সত্য বলে প্রতীয়মান হতে হয় কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায়।

JT=K যাচাইকৃত সত্যকে জ্ঞান বললে সমস্যা কী? এখানে একটা সন্দেহজনক অবস্থা তৈরি হলো আমার মনে। যাচাই করে কোনো কিছুকে সত্য বলে ঘোষণা দিলাম, তার মধ্যে কি বিশ্বাস নাই? এ ক্ষেত্রে সত্য দাবি করাকে আমরা হয়ত বিশ্বাস বলতে পারি। আবার বিশ্বাস করা মানে হলো, ‘কোনো কিছুকে বিশ্বাস করার ইচ্ছা’। এই ইচ্ছাই কি কোনো কিছুকে সত্য দাবি করে। তাহলে কূটাভাস হলো, এ ধরনের— ‘কিছু কিছু যাচাইকৃত সত্য আছে, যাকে আমরা বিশ্বাস করি না’। তবে যেহেতু JTB মানছি, তাহলে ওগুলো জ্ঞান হয় নাই। কারণ সত্য বলে দাবি করি নাই।

J=K: যাচাইকরণকে জ্ঞান বললে সমস্যা কী? আমি তো সত্য না মিথ্যা এটা যাচাই করব। এটা নির্ণয়ের সাপেক্ষে আমি বলব এটা সত্য বা মিথ্যা। এতে বিশ্বাস আছে বলেই দাবি করব। আরেকটা বিষয়, বিশ্বাসের নিশ্চয় একটা স্থর আছে, যতক্ষণ কোনো কিছু আমাদের সন্তুষ্ট না করে, ততক্ষণ আমরা বিশ্বাস করি না। সন্তুষ্ট হওয়ার ব্যাপারটা কী? আপাতত হলো, যাচাইকরণে পাওয়া নিশ্চয়তা।

TB=K: সত্য বিশ্বাসই কি জ্ঞান? না। কারণ শুধু ‘সত্য বিশ্বাস’ একটি ভৌতিক বিষয় বা কখনো কখনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা কাকতাল বিশ্বাস। সে ক্ষেত্রে আমাকে সত্যকে ‘সত্য’ আকারে প্রতিষ্ঠিত বা দাবি করার জন্য যাচাই করতে হবে। তারপর না হয়, তাকে জ্ঞান বলা যায়।

Ahasanullah Rafi: ধন্যবাদ Wahed Sujan ভাই, অত্যন্ত সহজ, সুন্দর এবং সাবলীলভাবে বিষয়টি ব্যাখা করার জন্য। 😊

Ahasanullah Rafi: T=K এর সমস্যা, আপনি এই স্ট্যাটাসটি লিখেছেন; কিন্তু আমি জানি না।

JB=K এর সমস্যা, আমি বিশ্বাস করি যে এরকম একটা স্ট্যাটাস আপনিই লিখতে পারেন; যেহেতু এর আগেও লিখেছিলেন, কিন্তু আজকে যে লিখেছেন এটা সত্য নয়।

B=K এর সমস্যা, আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে, এরকম একটা স্ট্যাটাস লেখার ক্রিয়েটিভিটি আপনার আছে, কিন্তু নিজের চোখে কোনোদিনও দেখিনি।

JT=K এর সমস্যা, আপনি যে স্ট্যাটাসটি লিখেছেন তা সত্য এবং আমি দেখেছিও। তারপরেও কিন্তু হলো, আমিতো আপনাকে বিশ্বাসই করিনা, তাই এটি কতটুকু জ্ঞানের আওতায় পড়বে এ ব্যাপারে আমি সত্যিই সন্দিহান।

J=K এর সমস্যা, আপনার স্ট্যাটাসটি যদিও দেখলাম, কিন্তু আপনি আমার বিশ্বস্ত কেউ না হওয়ার কারণে, (সম্ভবত) এটি সত্য নয়।

TB=K এর সমস্যা, আপনাকে বিশ্বাসও করি এবং মানি যে, আপনি যা বলবেন তা জ্ঞান না হয়ে পারেই না। কিন্তু দুঃখিত, আমিতো এখনো আপনার লেখা দেখিইনি।

JTB=K এর সমস্যা, এটিতো জনাব গেটিয়ার সাহেবই স্পষ্টভাবে ব্যাখা করে গেছেন।

শ্রদ্ধেয় স্যার, সমস্যা জাস্টিফাই করতে গিয়ে আমার কোথায় সমস্যা হয়েছে, একটু জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো।

Mohammad Mozammel Hoque: হ্যাঁ, আপনার রেসপন্সগুলো নিয়ে লিখছি। একটু পরে।

Saran Saran: Sir missing your lecture

Mohammad Mozammel Hoque: তোমার সাথে সেই স্মরণীয় ঘটনা…! ক্লাস হতে ফোন করে তোমাকে ক্লাসে ডেকে আনা। মনে পড়ে? নতুন স্টুডেন্টদের কাছে প্রসংগক্রমে মাঝে মাঝে এটি বলি।

Saran Saran: Yes sir. Upner akhono mone ache sir amader kotha.

Mohammad Mozammel Hoque: sure. why not? you were promising. তাছাড়া, with good academic intention টিচাররা যে স্টুডেন্টদের সাথে অনেক বেশি ইনভলভড হতে পারে তোমাকে ক্লাস থেকে ফোন করে ক্লাসে ডেকে আনার ঘটনাটি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ভালো থাকো।

Wahed Sujan: ‘TB একাউন্টকে রিফিইউট করার চেয়ে বরং এর অন্তর্গত অসংগতির ওপরই ছিলো গেটিয়ারের মূল ফোকাস।’— এটা ব্যাপারটা নিয়াই বোধহয় অনেক কথা বলা যায়। বিশেষ করে, ব্যাপারটা কেন এমন হলো। বাড়তি যা সাজেশন পাওয়া যায় তা কিন্তু JTB-র বাইরে যাওয়ার কথা বলছে না। আশ্চর্যজনকভাবে জ্ঞান হওয়ার শর্ত সীমিত। কিন্তু ব্যাখ্যা…!!!

Mohammad Mozammel Hoque: https://www.youtube.com/watch?v=vxgeQ9Jw-mk

লেখাটির ফেসবুক লিংক

আপনার মন্তব্য লিখুন

* চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক। আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।