দর্শন কী? প্রসঙ্গ: দর্শন ও ইসলাম

‘মানুষ’ মানুষ হয়েছে দর্শন চর্চার মাধ্যমে। মানুষ জানতে চেয়েছে, অতিক্রম করে যেতে চেয়েছে। তাতে সে অর্জন করেছে প্রযুক্তি, গড়ে তুলেছে বিজ্ঞান। হয়েছে সভ্য। চোখ দিয়ে আমরা দেখি। কিন্তু চোখকে দেখি না, যদি না আয়নার সামনে দাঁড়াই। তেমনি দর্শনে ডুবে থেকে মানুষ দর্শন সম্বন্ধে বেখবর হয়ে থাকে। বলে– ফিলোসফি ইজ ড্যাড। দর্শনের দরকার নাই। দর্শনের বিরোধিতা করার ব্যাপারে আস্তিক, ধর্মবাদী, সংশয়বাদী ও নাস্তিক – সব ক্যাটাগরির লোকদের একাংশের মধ্যে এক ধরনের ঐক্যমত লক্ষ্য করা যায়। স্টিফেন হকিংয়ের সর্বশেষ সাড়া জাগানো বইয়ের একটা চ্যাপ্টার হলো দর্শনের কথিত মৃত্যুর দাবি নিয়ে। এমনকি এসবি ব্লগের একজন অতি সম্মানিত বিদ্যজনও সম্প্রতি ইসলামের দিক থেকে দর্শনের বিরোধিতা করে পোস্ট দিয়েছেন।

মানুষ যখন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তখন সে যথাসম্ভব চেষ্টা করে তার নিকট স্বীকৃত মানদণ্ড দিয়ে যাচাই করে সর্বোত্তমকে গ্রহণ করতে। এমনকি মানুষ যখন লটারি করে তখনও সে র‍্যাশনাল ডিসিশন গ্রহণ করে। যেমন– কোন স্ত্রীকে সফরে সাথে নিবেন সেজন্য রাসূল (স) লটারি করতেন। যেভাবে আম্পায়ার বা রেফারিগণ লটারি করে থাকেন। মোদ্দা কথা হচ্ছে, যখনই আপনি কোনো সিদ্ধান্ত নিবেন, যে পদ্ধতিতেই হোক না কেন, সেটি অতি অবশ্য আপনার র‍্যাশনাল আন্ডারস্ট্যন্ডিংয়ের মাধ্যমে নিবেন। বলাবাহুল্য, এটিই হচ্ছে দার্শনিক পদ্ধতি। প্রতিটি মানুষই হচ্ছে এক একজন দার্শনিক।

মানুষ প্রতিনিয়ত পদার্থবিদ্যার নিয়ম মেনে চলাফেরা করে, যদিও সে জানে না কেন সে বাঁক নেবার সময় একটা নির্দিষ্ট মাপে হেলে চলে। একজন পদার্থবিদ্যাবিদও তাই করেন। অবশ্য তিনি নিয়মটি জানেন বা জানার চেষ্টা করেন। সেজন্য তিনি পদার্থবিদ্যাবিদ। আমাদের শরীরে নিয়ত শরীরবৃত্তিয় প্রক্রিয়াদি চলছে। এজন্য আমরা বেঁচে আছি বটে। কিন্তু আমরা জানি না এসব ফিজিওলজিক্যাল প্রসিডিউর কী বা কীভাবে হচ্ছে। একজন শরীরতত্ত্ববিদ সেটি জানে। যা জানে না তা জানার চেষ্টা করে। একজন কৃষক কৃষিবিদ্যার নিয়ম মেনেই চাষাবাদ করেন। কিন্তু তিনি জানেন না কৃষিবিদ্যা বিভাগে এসব বিষয় নিয়ে কী ধরনের জ্ঞানচর্চা হয়ে থাকে। তেমনি, যারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দর্শন চর্চা করেন তারা জানে ও জানার চেষ্টায় থাকে সব বিষয়ের মৌলিক জ্ঞান। সংশ্লিষ্ট জ্ঞানগত শাখাটি যেসব বিষয়কে স্বতঃসত্য বা ধ্রুবক হিসাবে (নির্বিচারে) গ্রহণ করে নিয়ে সামনে অগ্রসর হয়, দর্শনের কাজ হচ্ছে সেসব নিয়ে কাজ করা। তাই, ফিলোসফি ইজ অলওয়েজ ফিলোসফি অফ সামথিং।

মানুষ মঙ্গল গ্রহে নভোযান পাঠিয়েছে। আপনারা, ফিলোসফির লোকেরা কী করেছেন? একজন নবীন শিক্ষার্থীর এমন এক প্রশ্নের জবাবে আমি পকেট থেকে কলম বের করে বললাম, দর্শনের লোকেরা এরকম একটি কলমও তৈরি করতে পারে নাই। ন্যাশনাল জিডিপিতে তাদের কোনো অবদান নাই। তাহলে আমরা এটি কেন পড়বো? বা এটি কেন পড়ানো হবে? বিশ্বের নামকরা ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকেরই ফিলোসফি ডিপার্টমেন্ট বলে কোনো বিভাগ নাই। এটি হলফ করে বলা যায়। এ ব্যাপারে আপনি কী বলেন?

কোনো তথাকথিত ভালো সাবজেক্টে চান্স না পেয়ে বাধ্য হয়ে দর্শন বিভাগে ভর্তি হওয়া এই স্টুডেন্টের সাথে একমত হয়ে আমি স্বীকার করলাম যে, নভোযান পাঠানো তো দূরের কথা একটা সুঁইও দর্শনের লোকেরা বানাতে পারে নাই। তাকে বললাম, আচ্ছা ইরাক, আফগানিস্তান ইত্যাদি দেশে না হয় তেলের জন্য গেছে, মঙ্গল গ্রহে আমেরিকা পাথ ফাইন্ডার কেন পাঠালো? গুহা ও বন্য জীবন থেকে মানুষ কেন বের হয়ে আসলো? মানুষ কেন অজানাকে জানতে চায়? যা কিছু প্রচলিত, মানুষ কেন সেটিকে অতিক্রম করে নতুনকে পেতে চায়? কারণ, সিন্দাবাদের সেই কাঁধে চড়ে বসা বুড়ো ভূতের মতো দর্শনচেতনা মানুষকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। সে বুঝে না কেন সে ব্যবসায়ী না হয়ে বিজ্ঞানী হলো। বা, কেন সে বিজ্ঞানী না হয়ে সাহিত্যক হলো। যখনই আপনি ‘কেন’ নামক এই শব্দের সম্মুখীন হবেন, তখন কেনর উত্তর আপনি যা-ই ঠিক করেন না কেন, এমনকি কোনো উত্তরকেই ঠিক মনে না করলেও আপনি দর্শনের জালে জড়িয়ে গেলেন। দর্শনই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। জ্ঞান হলো দর্শনের পন্য।

আমরা বিজ্ঞান চর্চা করবো প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সুখ, কল্যাণ বা ভালোকে পাওয়ার জন্য। ভালো কথা। কিন্তু সুখ বলতে আমরা কি বুঝবো? কার সুখ? কিসের সুখ? কীভাবে? কিসের বিনিময়ে? আসলে ‘আমরা’ কারা? সবাই তো ভালো চাই। কিন্তু ভালোটা কোথায়? আদৌ কোনো পরম ভালো আছে কি? থাকলে এর যুক্তি কী? এ ধরনের সব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর গ্রহণ না করে মানুষ বাঁচতে পারে না। প্রত্যেকে নিজ নিজ দৃষ্টিতে সব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিয়ে সে মোতাবেক জীবনযাপন করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যদিও এসব ব্যাপার নিতান্ত অবচেতনে ঘটে বা ক্রিয়াশীল থাকে। ব্যক্তিকে প্রশ্ন করলে তার অবস্থানটা জানা যায়। দর্শনের ইতিহাস যত দিনের, ‘ফিলোসফি ইজ ডেড’ দাবিটির ইতিহাসও প্রায় ততদিনের। ফিলোসফির বিরুদ্ধে যারা যুক্তি দেন, মজার ব্যাপার হলো তারা কোনো না কোনো দার্শনিক গোষ্ঠীর মত ও যুক্তিকেই তুলে ধরেন।

দর্শনের কোনো কংক্রিট ফাইন্ডিংস নাই। থাকতে পারে না। যে বিষয়ে কোনো বিরুদ্ধ মত পাওয়া যাবে না তা দর্শন হতে পারে না। আর কোনো বিষয়ে কোনো কিছু সম্পর্কে মতৈক্য পাওয়া গেলে সেটি দর্শন হতে আলাদা হয়ে একটা স্বতন্ত্র ডিসিপ্লিন হিসাবে অগ্রসর হবে। যেভাবে একে একে সব সাবজেক্ট দর্শন হতে বের হয়ে গেছে। সর্বশেষ গেছে মনোবিদ্যা। এক সময় ফিজিক্সও ফিলোসফি হিসাবে ছিলো। দর্শনের কোনো পক্ষ নাই, থাকতে পারে না। তবে দার্শনিকের অবশ্যই কোনো না কোনো পক্ষ থাকবে। যুক্তি-পাল্টাযুক্তির মধ্যে ব্যক্তিমানুষকে কোনো একটা পক্ষে অবস্থান নিতে হয়। সতেচনভাবে না নিলে অবচেতন বা সামাজিকভাবে সে কোনো না কোনো পক্ষে নিজেকে আইডেন্টিফাই করে। দর্শন-শিক্ষকের কাজ হলো বিপরীত বা বিকল্প মত ও তৎসংশ্লিষ্ট যুক্তিসমূহ তুলে ধরা।

তাহলে আমরা প্রথম কথায় আবার ফেরত আসলাম – যখনই আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নেই তখন আমরা দার্শনিক পদ্ধতিতেই সেটি গ্রহণ করি। সেটি যা-ই হোক না কেন। ঈশ্বরবাদী, নিরীশ্বরবাদী বা সংশয়বাদী যা-ই হোন কেন, আপনি একটি দার্শনিক মতেরই অনুসরণ করছেন। আপনি জাতীয়তাবাদী হোন আর আন্তর্জাতিকতাবাদী – যাই হোন না কেন, আপনি একটা প্রতিষ্ঠিত দার্শনিক মতবাদকেই সঠিক হিসাবে গ্রহণ করছেন। মানুষকে বলা হয় বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণী। বুদ্ধিচর্চা তো দার্শনিকতারই নামান্তর মাত্র।

তাহলে, ইসলামের সাথে দর্শনের কী সম্পর্ক? ইসলামই হচ্ছে দর্শনের মূল কথা!? মজার ব্যাপার হলো দর্শনের খুব কম সংখ্যক লোকেরা এটি জানে। এবং ইসলামের লোকেরা ব্যাপকভাবে শক্ত করে কোমর বেঁধে এ কথার বিরোধিতা করছে ও করবে! আচ্ছা, মুয়াজ ইবনে জাবালকে রাসূল (স) যখন বললেন, ‘রা-সুল আমরি আল-ইসলাম’ (মূল বিষয় হলো ইসলাম) – এ কথা দ্বারা তিনি কী বুঝিয়েছিলেন? ইসলামের, বিশেষ করে ঈমানের পদ্ধতি কী? দর্শন চর্চা ইসলামে কতটুকু প্রাসঙ্গিক?

এসব প্রশ্নের বিষয়ে জানতে অপেক্ষা করুন, পরবর্তী পর্বের জন্য

মূল লেখার ব্যাকআপ লিংক

দর্শন কী? প্রসঙ্গ: দর্শন ও ইসলাম” শিরোনামের পোস্টটিতে ২টি মন্তব্য

আপনার মন্তব্য লিখুন

* চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক। আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।