শুরুটা শুরু করবেন কোত্থেকে?

যে কোনো আলোচনা যখন আপনি শুরু করেন তখন কোনো একটা জায়গা থেকেই আপনি শুরু করেন। তাই না? আমাদের জন্য একেবারে শুরুর জায়গাটা হচ্ছে আমাদের আত্মসত্তার উপস্থিতি বা চেতনা। এক কথায়, আমাদের অস্তিত্ব।

বিষয় যা-ই হোক না কেন, যে প্রশ্নই আপনি করেন না কেন, সেই প্রশ্নটা প্রশ্ন হিসেবে অর্থপূর্ণ, সঠিক বা বৈধ হবার জন্য কিছু বিষয়কে পূর্ব থেকেই সঠিক হিসেবে ধরে নিতে হয়।

আপনি যদি বলেন, ‘আমি জানি না’– এর মানে হলো, আপনি অন্তত এতটুকু নিশ্চিতভাবেই অলরেডি জানেন,

১) আপনি আছেন। কোথাও না কোথাও আছেন।

২) জ্ঞান বা জানা বলে একটা কিছু আছে, যা আপনার আওতার মধ্যে থাকার কথা বা আছে।

৩) আপনার এই অবস্থিত হওয়া এবং জ্ঞান নামক কিছু বিষয়ের পূর্ব-উপস্থিতি থাকা, এ বিষয়গুলোর সাথে আপনার মতোই সমভাবে সম্পর্কিত ও অবগত আরও কেউ কেউ আছে, যাদের কাছে প্রসঙ্গক্রমে আপনি এই কথাটা বলছেন।

এ বিষয়ে পরবর্তী বা শেষ কথাটা হচ্ছে,

৪) আপনার যা জানার কথা ছিল, বা যেটা আপনার পক্ষে জেনে নেয়ার সম্ভাব্যতা বা অপরিহার্যতা ছিল, সেটার ব্যাপারে আপনার অভিজ্ঞতা, মতামত বা সিদ্ধান্ত হচ্ছে যে আপনি তা জানেন না।

‘আমি জানি না’ কথাটাও আমাকে কিছু নিশ্চিত জ্ঞানের উপর নির্ভর করেই বলতে হয়! আপনার এই শুরুর জ্ঞানটুকু আপনি কোথা থেকে পেলেন?

এ নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে সংক্ষেপে শুধু এটাই বলতে চাচ্ছি– knowledge is a must, অর্থাৎ না জানার কোনো সুযোগ নাই। তবে আপনি কী, কতটুকু, কীভাবে ও কোন স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী জেনেছেন বা জানতে পারছেন, সেটা ভিন্ন কথা। সেই জানাটা কতটুকু ও কীভাবে কাজে লাগবে বা লাগাবেন, সেটা আরো পরের কথা।

এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে আপনারা ইতিমধ্যে বুঝে গেছেন, ‘আমি জানি না’ বা ‘আমার কোনো জ্ঞান নাই’, ‘জ্ঞান সম্ভব নয়’ বা ‘জ্ঞান অসম্ভব’– এই ধরনের সংশয়বাদী বা অজ্ঞেয়বাদী কথাগুলো ontologically বা তত্ত্বগতভাবে স্ববিরোধী বা সেল্ফ-রিফিউটিং। অর্থাৎ, ভুল।

কদিন আগে যেমনটা লিখেছি, আপনারা দেখেছেন, বস্তুবাদ হচ্ছে স্ববিরোধী মতবাদ। অবশ্য এর মানে এই নয়, ভাববাদই সঠিক। যদিও বস্তুবাদের মতো ভাববাদ self-refuting থিওরি নয়। ভাববাদের সমস্যা অন্য জায়গায়।

আপনারা জানেন, ফিলোসফিতে দুই ধরনের ভাববাদ আছে:

১) অধিবিদ্যাগত ভাববাদ (metaphysical idealism), যা বস্তুবাদের বিকল্প বা বিপরীত মতবাদ।

২) জ্ঞানতাত্ত্বিক ভাববাদ (epistemological idealism), যা বাস্তববাদের বিকল্প বা বিপরীত মতবাদ।

বস্তুবাদ হলো materialism। আর বাস্তববাদ হলো realism। বস্তুবাদ অনুসারে জগতে বস্তু-অতিরিক্ত কিছু নাই।

আর বাস্তববাদ অনুসারে কোনো কিছু অস্তিত্বশীল হওয়ার জন্য সেটা কোনো জ্ঞাতার জ্ঞানের বিষয় হওয়া অপরিহার্য নয়।

তার মানে, যে কোনো অস্তিত্ব হলো স্বাধীন ও স্বয়ং অস্তিত্ব। Whatever exists, exists by itself. যা বাস্তব তা বাস্তব। যা আছে তা আছে। কেউ জানলেও আছে। না জানলেও আছে। কারো জানা বা না জানা, কোনো কিছুর কোনো কিছু হওয়ার ওপর কোনো প্রভাব তৈরি করে না।

বস্তুবাদ ও ভাববাদের মতো বাস্তববাদের মধ্যেও আছে নানা ধরনের সমস্যা। অবশ্য ‘সমস্যা’ ছাড়া কোনো দার্শনিক তত্ত্ব হতেই পারে না। যেমন করে সমস্যা ছাড়া জীবন অসম্ভব।

সে যাই হোক, বস্তুবাদ আর ভাববাদের মাঝামাঝি একটা থিওরি আছে যেটাকে বলা হয় নিরপেক্ষ একত্ববাদ। বার্ট্রান্ড রাসেল হলেন এর প্রস্তাবক। বস্তুবাদ ও ভাববাদের এই দ্বন্দ্বে আমি রাসেলকেই ঠিক মনে করি।

আরব্য রজনীর গল্পের শেষ অংশের মতো আপনারও কৌতূহল জাগতে পারে, তাহলে neutral monism জিনিসটা কী? এ নিয়ে কথা হবে আরেকদিন, ইনশাআল্লাহ।

ফেসবুক থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

নূরে এলাহী শাফাত: ভাববাদের মূল সমস্যা কোন জায়গায়?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ব্যাপার হলো, দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে আমরা বস্তু এবং ভাব দুটোকেই বুঝতে পারি। কিন্তু যখন কোনো একটা পক্ষ নিয়ে সেটাকে আসল এবং অপর পক্ষটিকে সেটা থেকে উদ্ভূত বা উপজাত হিসেবে দাবি করা হয়, তখন সেটা এক ধরনের কাউন্টার ইনটুইটিভ হিসেবে মনে হয়। এর বাইরে এ বিষয়ে যেসব কেতাবি আলোচনা আছে সেগুলো খানিকটা জটিল বটে। একটা কমেন্টে লেখা মুশকিল।

Salman Farsi Nazmul: metaphysics আসলে কী? অধিবিদ্যা কথাটা ব্যখ্যা করলে খুশি হবো

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: সত্য কী? বাস্তবতা বলতে কী বুঝায়? আসলে আসল বলে কোনো কিছু কি আছে? জগতের কি কোনো সৃষ্টিকর্তা আছে? জগতের আদি উপাদান কী? এই ধরনের অস্তিত্ব ও সত্তা (being) রিলেটেড যেসব আলোচনা, সেগুলো হলো মেটাফিজিক্স বা অধিবিদ্যা।

জ্ঞানের উৎস কী? কীভাবে জ্ঞানকে যাচাই করা হবে? জ্ঞান সংক্রান্ত এই ধরনের যাবতীয় আলোচনা হলো জ্ঞানবিদ্যা বা এপিস্টেমোলজি।

নীতি-নৈতিকতা কী? নৈতিকতার ভিত্তি কী হতে পারে? নৈতিকতার মানদণ্ড কী হবে? কোথায় সেটা আমরা পাবো। কোন ধরনের নৈতিকতার কীভাবে প্রয়োগ হতে পারে? ইত্যাদি সংক্রান্ত আলোচনা হচ্ছে নীতিবিদ্যা বা এথিক্স।

কীভাবে আমরা বৈধ যুক্তি থেকে অবৈধ যুক্তিকে আলাদা করবো? কোন ধরনের যুক্তি ভালো? কোন ধরনের যুক্তি গ্রহণযোগ্য? ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে যুক্তিবিদ্যা বা লজিক।

এই দিক বা শাখাগুলোর সমন্বিত রূপ হলো ফিলোসফি বা দর্শন।

Salman Farsi Nazmul: অনেক ধন্যবাদ।

Mizanur Rahman: যেহেতু সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কোনো কিছুই বিদ্যমান থাকতে পারে না, কাজেই অস্তিত্বই হচ্ছে চিরস্থায়ী।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আপনার এই কথাটির বিপক্ষে ফিলোসফিতে যুক্তি আছে। হতে পারে সে যুক্তি আপনার ভালো লাগবে না। বা দুর্বল মনে হবে।

যে কোনো কথারই পক্ষ-বিপক্ষ মেরিট-ডিমেরিট নিয়ে যে আলোচনা, তা-ই হচ্ছে ফিলোসফি। যখনই আপনি, আমি বা কেউ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন মূলত ফিলোসফিক্যালি আমরা এটি গ্রহণ করি। যদিও আমরা সে সম্পর্কে সচেতন থাকি না। যেমন করে হাঁটা বা সাঁতার কাটার সময় আমরা পদার্থবিদ্যার কোন কোন নিয়ম অনুসারে কীভাবে তা করি, তা আমরা ঠিক বুঝতে পারি না।

Mizanur Rahman: যুক্তিটা যদি বলতেন তাহলে উপকৃত হতাম। জানতে চাই কী রকম সেই যুক্তি।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হ্যাঁ, মাঝে মাঝে এ রকম কিছু ফিলোসফিক্যাল বিষয় নিয়ে কথা বলবো। যদি স্মরণে থাকে, ইনশাআল্লাহ আপনার এই বিষয়টা নিয়েও কথা বলবো। ভালো হয়, ভুলে গেলে যদি আপনি আমাকে পরবর্তীতে স্মরণ করিয়ে দেন।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    * চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক। আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।