সৃজনশীলতা হলো bloom’s taxonomy’র সর্বোচ্চ ধাপ। আজকালকার দুনিয়ায় লেখাপড়া চলছে গড়পড়তা এই শিক্ষানীতি বা দর্শনের ভিত্তিতে।

আমরা জানি, ব্লুম’স টেক্সোনমি অনুযায়ী শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো সৃজনশীল হয়ে উঠার সক্ষমতা অর্জন। এ কাজ সম্পন্ন হতে পারে ৬ ধাপে: (১) to remember, (২) to understand, (৩) to apply, (৪) to analyze, (৫) to evaluate এবং (৬) to create।

এ নিয়ে ক’দিন আগে কথা হচ্ছিল একটা সেমিনারে। সেখানে আমাদের এক সহকর্মী একটা সিলি বাট সিগনিফিকেন্ট প্রশ্ন তুললেন। তিনি বললেন– ধরুন, দর্শনের মতো পুরনো সাবজেক্ট পড়তে গিয়ে কেউ ক্লাসিক্যাল কোনো টপিক নিয়ে পড়াশোনা করলো। কথার কথা, স্টুডেন্টরা ভাববাদ ও বাস্তববাদ নিয়ে পড়াশোনা করলো। তো, এই ধরনের ধ্রুপদী বিষয়গুলোতে বিদ্যমান তত্ত্ব ও যুক্তিগুলোর কোনোটিকে কোনোটির ওপর প্রাধান্য দেয়া ছাড়া একজন ছাত্রের পক্ষে আর কী করার থাকে? দৃশ্যত মুখস্ত করা ও বুঝার চেষ্টা করার বাইরে তার তো সৃজনশীলতার কোনো সুযোগ নাই। এহেন অবস্থার সাথে আমরা কীভাবে ব্লুম’স টেক্সোনমি সমন্বয় করবো?

এ বিষয় নিয়ে আমাদের এক তরুণ সহকর্মীর সাথে গতকাল আলোচনা করতে গিয়ে ভাবলাম, এ নিয়ে খানিকটা লিখি। তাতে করে ক্রিয়েটিভিটি সম্পর্কে অন্যরাও স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে পারবেন।

সংক্ষেপে বললে, সৃজনশীলতা হতে পারে তিন ধরনের বা স্তরের:

(১) মৌলিক সৃজনশীলতা: একেবারে নতুন কিছু করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রথম যিনি আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করেছিলেন, তার আবিষ্কারটি হলো সর্বোচ্চ স্তরের সৃজনশীলতা।

(২) সাধারণ সৃজনশীলতা: পুরনো কিছুকে ভিন্ন উপায়ে তৈরি করা। আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কারের উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, প্রথম যিনি আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করেছেন তার দেখানো পথে না গিয়ে নতুন কোনো পথে সেখানে যাওয়ার উপায় বের করা হলো দ্বিতীয় স্তরের সৃজনশীলতা বা সেকন্ড লেভেল বেসিক ফাইন্ডিং।

(৩) ব্যক্তিগত সৃজনশীলতা: যিনি প্রথম আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করেননি কিংবা ভিন্ন পথে সেখানে যাওয়ার পথও বের করেননি বা করতে পারেননি; তিনি যখন জীবনে প্রথমবার সেখানে গেলেন তখন তিনিও আমেরিকায় নিয়ে এক ধরনের ক্রিয়েটিভিটির পরিচয় দিলেন। তার দিক থেকে এটি একটা সৃজনশীল কর্ম হলো।

প্রথম পর্যায়ের তুলনায় দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্রিয়েটিভিটি ততটা ক্রিয়েটিভ নয়। এমনিভাবে দ্বিতীয় পর্যায়ের তুলনায় তৃতীয় পর্যায়েরটি ততটা ক্রিয়েটিভ নয়। এবং প্রথম ও দ্বিতীয় ধরনের আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের তুলনায় তৃতীয় ধরনের কাজ মোটেও সৃজনশীল কিছু নয়।

যদিও, কিছুই জানে না এমন লোকের তুলনায় অপরের দেখানো পথে যে ব্যক্তি কোনো কিছু জেনেছে তার কাজটাও ক্রিয়েটিভ। নবতর কিছু অর্জন কিংবা জ্ঞানের সীমানা ও গভীরতাকে অধিকতর বিস্তৃত করা অর্থে এটি ক্রিয়েটিভ।

বুঝতেই পারছেন, ক্রিয়েটিভিটির এই বেসিক লেভেলের তুলনায় পুরনো জিনিসের নতুন সংস্করণ যিনি বের করেছেন বা পুরনো জিনিসকে তৈরি করার নতুন কোনো উপায় যিনি উদ্ভাবন করেছেন, তার কাজটি মোর ক্রিয়েটিভ। ক্রিয়েটিভিটি বলতে আমরা সর্বোচ্চ লেভেলের ক্রিয়েটিভিটিকেই সাধারণত বুঝে থাকি। পুরনো উদ্ভাবন বা আবিষ্কারের নতুন উপায় বা পদ্ধতি বের করাও যে এক ধরনের ক্রিয়েটিভ ওয়ার্ক, এটাও আমরা এখন বুঝলাম। আবার, অন্যদের জন্য পুরনো হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে নতুন, এমন কোনো কিছুকে নিজের মতো করে জানা ও এক্সপ্লোর করাও যে ক্রিয়েটিভিটির অন্তর্ভুক্ত, সেটাও আমরা বুঝতে পারলাম।

অন্য কেউ ইতোমধ্যে এটি না বললে, হয়তো সে-ই এটি প্রথম বলতো। অন্যরা আগেই সম্পন্ন করে না ফেললে হয়তো সে-ই এটি প্রথম সম্পন্ন করতো। একজন ব্যক্তি যখন অন্যদের উদ্ভাবিত বা আবিষ্কৃত পথে কিছু পাওয়ার জন্য অগ্রসর হয় তখন, এ ব্যাপারে আদৌ কিছু জানে না এমন ব্যক্তির তুলনায় সেই ব্যক্তির এই কাজটি অবশ্যই সৃজনশীল।

জ্ঞান অর্জন মাত্রই একটি সৃজনশীল কর্ম। এই সৃজনশীলতা অন্য সবার কাছে সৃজনশীল না হলেও অজ্ঞতার তুলনায় তা অবশ্যই সৃজনশীল। যদিও এই ধরনের সৃজনশীলতা ব্যক্তির একান্ত জগৎ বা পরিচিত মণ্ডলের বাইরে কোনো প্রভাব সৃষ্টি করে না।

এবার আসেন ফিলোসফির মতো একটি সাবজেক্টে ক্রিয়েটিভিটির ধরন কী রকম হতে পারে তা নিয়ে একটুখানি আলোচনা করি।

গ্রীক ফিলোসফির পরে পাশ্চাত্য দর্শনের ধারায় নতুন কিছু হওয়ার পথ আমার ধারণায় exhausted অর্থে রুদ্ধ হয়ে গেছে। পরবর্তীতে ফিলোসফারেরা যা করেছেন বা করছেন তা বড়জোর দ্বিতীয় পর্যায়ের সৃজনশীলতা। আর যে ছাত্র বা ছাত্রীটা ফিলোসফি পড়ছে, সে যদি সংশ্লিষ্ট টপিকটা ভালো করে বুঝে থাকে এবং বিদ্যমান তত্ত্ব ও যুক্তিগুলোর মধ্যে কোনোটাকে যদি সে নিজ বুঝজ্ঞান অনুসারে অপরাপর তত্ত্ব ও যুক্তিসমূহের চেয়ে প্রাধান্য দেয়, তাহলে ওই বিষয়ে তার এই ধরনের জ্ঞান অর্জনও তার দিক থেকে নিঃসন্দেহে একটি সৃজনশীল কর্ম।

সৃজনশীল কাজ মানেই নতুন কিছু হবে, এটি একটি ভুল ধারণা। ব্যক্তির একান্ত বোধ বা আন্ডারস্ট্যান্ডিং দ্বারা পরিচালিত কাজ মাত্রই কোনো না কোনো মাত্রায় একটি সৃজনশীল কর্ম। সেটি যদি পুরনো বা বহুল চর্চিত কোনো কাজও হয়ে থাকে। সবার জন্য না হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য এটি নতুন কিছু।

যেমন, বাচ্চারা ব্লক দিয়ে নতুন কিছু তৈরি করে। বড়দের জন্য না হলেও তাদের জন্য কিন্তু এই ধরনের কাজ অতি অবশ্যই একটি সৃজনশীল কর্ম। সৃজনশীলতার লক্ষ্য অর্জন ব্যতিরেকে শিক্ষা গ্রহণ বা প্রদানের উদাহরণ হলো সুন্দর গাড়িতে করে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ানো।

মানুষ মানুষ হয়েছে সৃজনশীলতার কারণে। সৃজনশীলতা ব্যতিরেকে মানুষের জীবন অর্থহীন ও ব্যর্থ। তাই সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে যাতে করে প্রত্যেককেই একটি সৃজনশীল জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক