‍“নীরবতা হলো পৃথিবীর শুদ্ধতম ভাষা”— কথাটা কি সঠিক?

নীরবতা মানে কি নৈঃশব্দ? নিস্তব্ধতা?

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে, পৃথিবীতে তো কোনো নিরবতা নাই। নাই নৈঃশব্দ। আছে শ্রবণ-সীমাবদ্ধতা।

নীরবতা মানে যদি হয় নীরব ভাষা, তাহলেও লাভের লাভ কতটুকুই বা হলো? ভাষা তো থাকলোই।

বলা হয়, ভাষার মাত্র শতকরা ৭ ভাগ হলো উক্ত। বাদবাকি শতকরা ৯২ ভাগ অনুক্ত অংশের মধ্যে শরীরী ভাষা হলো শতকরা ৫৫ ভাগ। অবশিষ্ট ৩৮ ভাগ হলো গলার টোন।

বস্তুগতভাবে নাই এমন কিছু কিছু বিষয়কে আমরা বস্তুগত জ্ঞানের চেয়েও অনেক বেশি নিশ্চিত হিসেবে গ্রহণ করি। যেগুলো আমাদের বস্তুগত জ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এগুলোকে আমরা বলি তত্ত্বগত জ্ঞান বা মেটাফিজিক্যাল নলেজ।

নৈঃশব্দ বা সাইলেন্স হলো তেমন ধরনের একটা মেটাফিজিক্যাল বিষয়।

জ্ঞানতত্ত্বে অভিজ্ঞতা-পূর্ব জ্ঞান (a priori knowledge) এবং অভিজ্ঞতা-পরবর্তী জ্ঞান (a posteriori knowledge) বলে দুটো বিষয় আছে। কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করে আমরা বুঝতে পারি, অভিজ্ঞতাটি অর্জন করার পূর্ব থেকেই ওই বিষয়ের কিছু কিছু বিষয় ইতোমধ্যে বিদ্যমান ছিল।

এই দৃষ্টিতে বলা যায়, নীরবতা বা নৈঃশব্দ ছিল বা আছে বলেই আমাদের কথ্যভাষা (verbal language) সম্ভবপর হয়ে ওঠে।

এই আলাপ থেকে পুনরায় আমরা এই কথাটুকু বুঝতে পারলাম, আমাদের ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমরা যে ধরনের বস্তুগত জ্ঞান পেয়ে থাকি তার বাইরেও কিছু অবস্তুগত জ্ঞান আছে যেগুলো আমাদের অভিজ্ঞতাগত জ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এইভাবে কোনো কিছুকে নিছক বুদ্ধির সাহায্যে জানতে পারা বা বুঝতে পারা হলো তত্ত্ববিদ্যা বা অন্টলজির বিষয়।

তত্ত্ববিদ্যার সাহায্যে (ontologically) আমরা কোনো মেটাফিজিক্যাল এনটিটিকে জানতে পারি, সাধারণভাবে যা বুদ্ধিগত জ্ঞান (rational knowledge) হিসেবে বিবেচিত।

যারা সব জ্ঞানকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে চায়, সামান্য এই বিষয়টা নিয়ে আমার এই অত্যন্ত সাধারণ ফিলোসফিক্যাল ইনসাইট তাদের জন্য একটা … (খুব খারাপ কিছু)!

হ্যাঁ, কথাটা শুনতে যেমন লাগুক না কেন, বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে যে জ্ঞান, সেই জ্ঞান শুধু ধর্মকেই নয়, আমাদের সমগ্র সাহিত্য এবং সাধারণ কথাবার্তাসহ অ-বৈজ্ঞানিক সবকিছুকেই নাকচ করে। এমনকি আমাদের মূল্যবোধভিত্তিক এবং ব্যক্তিনিষ্ঠ (normative and subjective) যে কোনো কিছুকেই এই তথাকথিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নাকচ করে দেয়।

তো, সবকিছুকে নাকচ করে শেষ পর্যন্ত একলা বিজ্ঞান কতটুকু টিকে, সেটাই হলো জানার বিষয়। এবং বিজ্ঞানপূজারী, যাদেরকে আমি বলি বিজ্ঞানবাদী (sciencist), তাদের কাছে আমার প্রশ্ন।

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Remon Ahmed: স্যার, আপনি বলেছিলেন, মেটাফিজিক্যাল বিষয়গুলোর অস্তিত্ব না থাকলে ফিজিক্যাল বিষয়গুলোর অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না। যেমন: নৈঃশব্দ না থাকলে শব্দও থাকবে না। এই বিষয়টা যদি একটু বিস্তারিত বুঝিয়ে বলতেন।

Mohammad Mozammel Hoque: হ্যাঁ, তুমি এমন একটা জগত সম্পর্কে কল্পনা করতে চেষ্টা করো, যেখানে কোনো নৈঃশব্দ্য নাই। শুধু শব্দ আছে। দেখো পারো কিনা। আমি নিশ্চিত সেটা তুমি পারবে না। কারণ, নৈঃশব্দের ধারণা আছে এবং কিছু কিছু বিষয়কে আমরা শব্দহীন বা সাইলেন্ট হিসেবে ধরে নেই, যার কারণে আমরা শব্দগুলোকে শব্দ হিসেবে চিনতে পারি।

Remon Ahmed: কোনো সাইলেন্স নেই, শুধু আমরা শুনি না, শব্দ সর্বত্র।

এখন আমার কথা হলো, ঠিক একই রকমভাবে কোনো অন্ধকার নেই, শুধু আমরা দেখি না। অন্ধকার, নৈঃশব্দ— এগুলো কি সময় বা বয়সের মতো ধারণা? নাকি আলোক কণা বা শব্দতরঙ্গের ন্যায় বিপরীত কোনো সৃষ্টি??

Enam Haque: ভারতীয় বাংলা একটা সিনেমা আছে, ‌‘শব্দ’। সুন্দর।

Mohammad Mozammel Hoque: হ্যাঁ, সিনেমাটা আমি দেখেছি। এবং এটা খুব ভালো সিনেমা। আমার এই লেখাটার সেটাও একটা অনুপ্রেরণা। সেখানে এ ধরনের ডায়লগ আছে, there is no silence. we just don’t listen. sound is everywhere.

Nazrul Islam: প্রত্যেকটা শব্দই কী ভাষা হতে পারে?

Mohammad Mozammel Hoque: কেন নয়?

Nazrul Islam: তাহলে মেশিনের শব্দ, কোনো বস্তুর পতনের শব্দ ইত্যাদি কি ধরনের ভাষা?

Mohammad Mozammel Hoque: মেশিন ল্যাঙ্গুয়েজ বলে একটা সুপ্রতিষ্ঠিত কথা আছে কম্পিউটার সায়েন্সে। যদিও বাইনারি পদ্ধতিতে সেটা লিপিবদ্ধ করা হয়। কোনো কথার লিখিত রূপ আর কথ্য রূপ এক হয় না, এটা বলাই বাহুল্য। একই অর্থ বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হতে পারে।

মোহাম্মাদ ফেরদৌস হাসান: ‌‘কুন ফায়া কুন’…। আধুনিক বিজ্ঞানও বলছে কণারা তাদের চূড়ান্ত পর্যায়ে একটা ওয়েভের মতো আচরণ করে। আপনার লেখা পড়ে ‌‘কুন’ শব্দের কথা মনে পড়ে গেলো। নাথিংনেস নিয়ে একটা পোস্ট চাচ্ছি।

Mohammad Mozammel Hoque: বিজ্ঞানবাদীদের নাথিংনেস নিয়ে কিছু কথা

Mohammad Mozammel Hoque: ‌‘শব্দ’ মুভির লিংক:

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

আপনার মন্তব্য লিখুন

অনুগ্রহপূর্বক আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহপূর্বক এখানে আপনার নাম লিখুন